ঢাকা ০৭:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রেক্সিটের ১০ বছর পরও কেন দূরত্ব কাটছে না ব্রিটেন-ইইউ?

ব্রেক্সিটের ১০ বছর পূর্তিতে লন্ডনে ‘রিজয়েন’ মার্চে অংশগ্রহণকারীরা। ছবি: সংগৃহীত

ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ত্যাগের সিদ্ধান্ত বা ব্রেক্সিটের ১০ বছর পূর্ণ হলেও লন্ডন ও ব্রাসেলসের সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। দুই পক্ষের মধ্যে আগের তুলনায় উত্তেজনা কমলেও অভিবাসন, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো সম্পর্কের বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোটে ব্রিটিশ জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দেয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ থেকে বেরিয়ে যায় যুক্তরাজ্য। এর মাধ্যমে ৪৭ বছরের সদস্যপদের সমাপ্তি ঘটে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনের অর্থনীতি প্রত্যাশিত সুবিধা পায়নি। একই সঙ্গে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতাও বেড়েছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদে একাধিক পরিবর্তন হয়েছে, যা প্রায় দুই শতাব্দীর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।

ইইউর সাবেক প্রধান ব্রেক্সিট আলোচক এবং ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিশেল বার্নিয়ে মনে করেন, ব্রিটেনের সব সমস্যার জন্য ব্রেক্সিট দায়ী নয়। তবে তার মতে, ব্রেক্সিটের কারণে দেশটির বিদ্যমান সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে ব্রেক্সিটপন্থীরা এখনো এটিকে সফল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। তাদের যুক্তি, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ব্রিটেনকে আরও কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিতে স্বাধীনতা বাড়ার কথা তারা উল্লেখ করেন।

ব্রেক্সিটের পর দুই পক্ষের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা শুরু হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের সময়। পরে ২০২৪ সালে লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমার ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রচেষ্টা আরও জোরদার হয়। এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।

গত বছর ব্রিটেন ও ইইউ একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছায়। এর মাধ্যমে ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাত শক্তিশালী করার জন্য গঠিত একটি বড় তহবিলে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি খাদ্য, কৃষিপণ্য, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ সংক্রান্ত বাণিজ্য সহজ করার বিষয়েও আলোচনা এগিয়েছে।

তবে এসব অগ্রগতির পরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অচলাবস্থা রয়ে গেছে। বিশেষ করে যুব ভিসা ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা হয়নি। ফলে সম্পর্ক উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি দৃশ্যমান হয়নি।

লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান রিফর্মের প্রধান চার্লস গ্রান্ট বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা খুব ধীরগতির। তার মতে, পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।

বিশেষ করে ফ্রান্স, জার্মানি এবং ব্রিটেনে ডানপন্থী ও জনতাবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এসব রাজনৈতিক দল ইউরোপীয় একীকরণের বিরোধিতা করে এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অভিবাসন ইস্যুকে গুরুত্ব দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে ব্রিটেন কি আবার ইইউর একক বাজারে যোগ দেবে, নাকি কাস্টমস ইউনিয়নের মতো কোনো ব্যবস্থায় ফিরবে—এ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। যদিও পূর্ণ সদস্যপদে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা এখনো অনেক দূরের বিষয় বলে মনে করা হচ্ছে।

জনমত জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটেনের অনেক নাগরিক এখন ব্রেক্সিট নিয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করছেন। তবে পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য খরচ, অভিবাসন নীতি এবং ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেই সমর্থন কমে যায়।

ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বার্নিয়ে ব্রেক্সিটকে উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষতির কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতায় ব্রিটেন ও ইইউকে আবারও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীনের মতো শক্তিগুলোর কারণে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

তবে এক দশক পরও ব্রেক্সিটকে ঘিরে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল, তার অনেকটাই এখনো বিদ্যমান। ব্রিটিশ রাজনীতির একটি অংশ এখনো ইইউকে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে। অন্যদিকে ইউরোপীয় নেতারাও ব্রেক্সিট বিতর্কের তিক্ত স্মৃতি পুরোপুরি ভুলতে পারেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে ব্রিটেন ও ইইউর সম্পর্ক আরও উন্নত হতে পারে। তবে এর জন্য উভয় পক্ষকেই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক মতভেদ কমিয়ে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের মতো অভিন্ন স্বার্থের বিষয়ে গুরুত্ব দিলে সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্রেক্সিটের ১০ বছর পরও কেন দূরত্ব কাটছে না ব্রিটেন-ইইউ?

Update Time : ০৩:৪৯:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ত্যাগের সিদ্ধান্ত বা ব্রেক্সিটের ১০ বছর পূর্ণ হলেও লন্ডন ও ব্রাসেলসের সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। দুই পক্ষের মধ্যে আগের তুলনায় উত্তেজনা কমলেও অভিবাসন, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো সম্পর্কের বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোটে ব্রিটিশ জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দেয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ থেকে বেরিয়ে যায় যুক্তরাজ্য। এর মাধ্যমে ৪৭ বছরের সদস্যপদের সমাপ্তি ঘটে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনের অর্থনীতি প্রত্যাশিত সুবিধা পায়নি। একই সঙ্গে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতাও বেড়েছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদে একাধিক পরিবর্তন হয়েছে, যা প্রায় দুই শতাব্দীর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।

ইইউর সাবেক প্রধান ব্রেক্সিট আলোচক এবং ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিশেল বার্নিয়ে মনে করেন, ব্রিটেনের সব সমস্যার জন্য ব্রেক্সিট দায়ী নয়। তবে তার মতে, ব্রেক্সিটের কারণে দেশটির বিদ্যমান সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন  হরমুজ প্রণালী সংকটে সহায়তার প্রস্তাব শি জিনপিংয়ের

অন্যদিকে ব্রেক্সিটপন্থীরা এখনো এটিকে সফল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। তাদের যুক্তি, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ব্রিটেনকে আরও কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিতে স্বাধীনতা বাড়ার কথা তারা উল্লেখ করেন।

ব্রেক্সিটের পর দুই পক্ষের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা শুরু হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের সময়। পরে ২০২৪ সালে লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমার ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রচেষ্টা আরও জোরদার হয়। এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।

গত বছর ব্রিটেন ও ইইউ একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছায়। এর মাধ্যমে ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাত শক্তিশালী করার জন্য গঠিত একটি বড় তহবিলে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি খাদ্য, কৃষিপণ্য, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ সংক্রান্ত বাণিজ্য সহজ করার বিষয়েও আলোচনা এগিয়েছে।

তবে এসব অগ্রগতির পরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অচলাবস্থা রয়ে গেছে। বিশেষ করে যুব ভিসা ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা হয়নি। ফলে সম্পর্ক উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি দৃশ্যমান হয়নি।

আরও পড়ুন  যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্য সহায়তা হারাচ্ছেন ৩০ লাখ মানুষ, নতুন নিয়মে ধাক্কা

লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান রিফর্মের প্রধান চার্লস গ্রান্ট বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা খুব ধীরগতির। তার মতে, পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।

বিশেষ করে ফ্রান্স, জার্মানি এবং ব্রিটেনে ডানপন্থী ও জনতাবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এসব রাজনৈতিক দল ইউরোপীয় একীকরণের বিরোধিতা করে এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অভিবাসন ইস্যুকে গুরুত্ব দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে ব্রিটেন কি আবার ইইউর একক বাজারে যোগ দেবে, নাকি কাস্টমস ইউনিয়নের মতো কোনো ব্যবস্থায় ফিরবে—এ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। যদিও পূর্ণ সদস্যপদে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা এখনো অনেক দূরের বিষয় বলে মনে করা হচ্ছে।

জনমত জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটেনের অনেক নাগরিক এখন ব্রেক্সিট নিয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করছেন। তবে পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য খরচ, অভিবাসন নীতি এবং ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেই সমর্থন কমে যায়।

আরও পড়ুন  কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে জাতিসংঘে পাকিস্তানের নতুন দাবি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বার্নিয়ে ব্রেক্সিটকে উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষতির কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতায় ব্রিটেন ও ইইউকে আবারও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীনের মতো শক্তিগুলোর কারণে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

তবে এক দশক পরও ব্রেক্সিটকে ঘিরে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল, তার অনেকটাই এখনো বিদ্যমান। ব্রিটিশ রাজনীতির একটি অংশ এখনো ইইউকে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে। অন্যদিকে ইউরোপীয় নেতারাও ব্রেক্সিট বিতর্কের তিক্ত স্মৃতি পুরোপুরি ভুলতে পারেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে ব্রিটেন ও ইইউর সম্পর্ক আরও উন্নত হতে পারে। তবে এর জন্য উভয় পক্ষকেই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক মতভেদ কমিয়ে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের মতো অভিন্ন স্বার্থের বিষয়ে গুরুত্ব দিলে সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে।