অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার পথে দেশটির সরকার। ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে রাখতে আগেই আইন চালু করা হলেও বাস্তবে অনেকেই বয়স গোপন করে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। এ কারণে আইন কার্যকর করতে ব্যর্থ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমান ৪ কোটি ৯৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের পরিবর্তে সর্বোচ্চ জরিমানা বাড়িয়ে ৯ কোটি ৯০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার করা হবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকারও বেশি। সরকারের দাবি, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের অ্যাকাউন্ট খোলা ঠেকাতে যথেষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
এ লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশনারকে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়া হবে। নতুন আইন কার্যকর হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সরাসরি প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে তথ্য চাইতে পারবে। শুধু তাই নয়, বয়স যাচাই সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা অ্যাপ স্টোর পরিচালনাকারী তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। এতে প্ল্যাটফর্মগুলোর দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই সহজ হবে।
বর্তমানে মেটার ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম, গুগলের ইউটিউব, টিকটক এবং স্ন্যাপচ্যাটের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারের অভিযোগ, এসব প্ল্যাটফর্ম শিশুদের বয়স যাচাইয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করছে না। ফলে অনেক কিশোর-কিশোরী সহজেই বয়স পরিবর্তন করে অ্যাকাউন্ট খুলতে সক্ষম হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আইন কার্যকর হওয়ার তিন মাস পরও ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয়দের প্রায় ৮৫ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে। তাদের বড় একটি অংশ নিজের বয়স ১৬ বছরের বেশি দেখিয়ে বা সেলফিভিত্তিক যাচাই পদ্ধতি ফাঁকি দিয়ে প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, কেবল প্রযুক্তি নয়, এর কার্যকর প্রয়োগই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেছেন, শিশুদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তাঁর মতে, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে এখনও প্রয়োজনীয় দায়িত্বশীলতা দেখাতে পারেনি। তাই শিশুদের সুরক্ষায় আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, আইন চালুর পর এখন পর্যন্ত ১৬ বছরের কম বয়সীদের ৫০ লাখের বেশি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে অথবা বিধিনিষেধের আওতায় আনা হয়েছে। তবে গবেষণা বলছে, এতেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। ফলে নতুন আইন কার্যকর হলে কোম্পানিগুলোর ওপর আরও বেশি চাপ তৈরি হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশও অস্ট্রেলিয়ার এই উদ্যোগ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুমের সমস্যা, আসক্তি এবং অনলাইন ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা আরও কঠোর নীতিমালা বিবেচনা করছে, যেখানে গেমিং এবং লাইভ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতের একটি শিল্প সংগঠন দাবি করেছে, বয়স যাচাই প্রযুক্তিতে তেমন সমস্যা নেই। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো বিদ্যমান প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহার না করায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। এ কারণেই অস্ট্রেলিয়া সরকার সরাসরি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চাইছে।
তবে নতুন এই আইনি উদ্যোগ বিতর্কও তৈরি করেছে। অনলাইন আলোচনা প্ল্যাটফর্ম রেডিট ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ আদালতে এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের দাবি, এই আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও সরকার জানিয়েছে, আদালতে তারা নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বয়স যাচাই ব্যবস্থা আরও নির্ভুল করা, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে এই ধরনের নীতিমালার কার্যকারিতা আরও বাড়বে।



























