ঢাকা ০১:০৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতীয় ভিসা চালু, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন বার্তা?

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে প্রায় দুই বছর পর আবারও স্বাভাবিক ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রোববার (২৮ জুন) থেকে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন ট্যুরিস্ট ভিসাসহ নিয়মিত ভিসা আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও সীমান্তে পুশ-ইন, তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে ভারত বাংলাদেশিদের জন্য কেবল সীমিত পরিসরে মেডিকেল ভিসা চালু রেখেছিল। ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ থাকায় চিকিৎসা, ভ্রমণ, ব্যবসা কিংবা তৃতীয় কোনো দেশের ভিসার জন্য ভারত হয়ে যাতায়াত করতে ইচ্ছুক অনেক বাংলাদেশি ভোগান্তিতে পড়েছিলেন। নতুন করে ভিসা আবেদন চালু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

গত ২৫ জুন বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার পরিদর্শন করেন। সেখানেই তিনি ২৮ জুন থেকে স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম চালুর ঘোষণা দেন। তার এই ঘোষণাকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দৃশ্যত শীতল হয়ে পড়ে। দুই দেশের মধ্যে ভিসা কার্যক্রম সীমিত হয়ে যায় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের কারণে কূটনৈতিক অস্বস্তিও তৈরি হয়। এমনকি দুই দেশের হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ এবং কূটনীতিকদের তলবের ঘটনাও সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে শুরু করে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সফর, প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে ফোনালাপ এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। এই প্রেক্ষাপটেই ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর ঘোষণা আসে।

তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টাকে দিল্লি বিমানবন্দরে হেনস্তার অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তির সৃষ্টি করেছিল। এরপরও ভিসা কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্তকে অনেকেই ইতিবাচক কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় এই ঘোষণা আসায় বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় আসে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মোহাম্মদ সুফিউর রহমানের মতে, ভারত এমন একটি কার্যক্রমই স্বাভাবিক করেছে, যা অনেক আগেই করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, ভিসা কার্যক্রম দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কের একটি মৌলিক অংশ এবং এটি পুনরায় চালু হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাসও মনে করেন, মানুষের অবাধ যাতায়াত দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার মতে, জনগণের যোগাযোগ যত বাড়বে, ততই আলোচনা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত হবে এবং সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল ভিসা চালু হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। সামনে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সঙ্গে বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু।

এর পাশাপাশি সীমান্তে কথিত ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক লোক পাঠানোর অভিযোগও দুই দেশের সম্পর্কের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব সংবেদনশীল বিষয়ে ন্যায়সংগত ও পারস্পরিক সম্মানজনক সমাধান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে আরও টেকসই করতে হলে জনগণকেন্দ্রিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সীমান্ত, পানিবণ্টন এবং অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা গেলে দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার নতুন ভিত্তি তৈরি হতে পারে। ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়া সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতীয় ভিসা চালু, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন বার্তা?

Update Time : ০৯:০৪:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

বাংলাদেশে প্রায় দুই বছর পর আবারও স্বাভাবিক ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রোববার (২৮ জুন) থেকে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন ট্যুরিস্ট ভিসাসহ নিয়মিত ভিসা আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও সীমান্তে পুশ-ইন, তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে ভারত বাংলাদেশিদের জন্য কেবল সীমিত পরিসরে মেডিকেল ভিসা চালু রেখেছিল। ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ থাকায় চিকিৎসা, ভ্রমণ, ব্যবসা কিংবা তৃতীয় কোনো দেশের ভিসার জন্য ভারত হয়ে যাতায়াত করতে ইচ্ছুক অনেক বাংলাদেশি ভোগান্তিতে পড়েছিলেন। নতুন করে ভিসা আবেদন চালু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

গত ২৫ জুন বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার পরিদর্শন করেন। সেখানেই তিনি ২৮ জুন থেকে স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম চালুর ঘোষণা দেন। তার এই ঘোষণাকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

আরও পড়ুন  বিদ্যুতের দর আগের দামেই ফিরল নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য, বিল বাড়ছে না

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দৃশ্যত শীতল হয়ে পড়ে। দুই দেশের মধ্যে ভিসা কার্যক্রম সীমিত হয়ে যায় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের কারণে কূটনৈতিক অস্বস্তিও তৈরি হয়। এমনকি দুই দেশের হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ এবং কূটনীতিকদের তলবের ঘটনাও সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে শুরু করে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সফর, প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে ফোনালাপ এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। এই প্রেক্ষাপটেই ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর ঘোষণা আসে।

তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টাকে দিল্লি বিমানবন্দরে হেনস্তার অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তির সৃষ্টি করেছিল। এরপরও ভিসা কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্তকে অনেকেই ইতিবাচক কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় এই ঘোষণা আসায় বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় আসে।

আরও পড়ুন  আগামীকাল ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যে এলাকায়

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মোহাম্মদ সুফিউর রহমানের মতে, ভারত এমন একটি কার্যক্রমই স্বাভাবিক করেছে, যা অনেক আগেই করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, ভিসা কার্যক্রম দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কের একটি মৌলিক অংশ এবং এটি পুনরায় চালু হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাসও মনে করেন, মানুষের অবাধ যাতায়াত দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার মতে, জনগণের যোগাযোগ যত বাড়বে, ততই আলোচনা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত হবে এবং সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল ভিসা চালু হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। সামনে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। একই সঙ্গে বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু।

আরও পড়ুন  ভারতের কাছে হাসিনার প্রত্যর্পণ চাইল বাংলাদেশ সরকার

এর পাশাপাশি সীমান্তে কথিত ‘পুশ-ইন’ বা জোরপূর্বক লোক পাঠানোর অভিযোগও দুই দেশের সম্পর্কের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব সংবেদনশীল বিষয়ে ন্যায়সংগত ও পারস্পরিক সম্মানজনক সমাধান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে আরও টেকসই করতে হলে জনগণকেন্দ্রিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সীমান্ত, পানিবণ্টন এবং অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা গেলে দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার নতুন ভিত্তি তৈরি হতে পারে। ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়া সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।