ঢাকা ০১:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গভীর ঘুম কমলেই বাড়তে পারে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি, নতুন গবেষণার সতর্কবার্তা

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমান, নিয়মিত ব্যায়াম করুন—গভীর ঘুম নিশ্চিত করে মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখুন।

গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে গেলে ৬০ বছরের বেশি বয়সিদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকদের দাবি, প্রতি বছর গভীর ঘুম মাত্র ১ শতাংশ কমে গেলেই ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে শুধু ঘুমের সময় নয়, ঘুমের মানের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর ঘুমের অভাব দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী জামা নিউরোলজি-তে। গবেষকদের মতে, বয়সের সঙ্গে গভীর ঘুম কিছুটা কমে যাওয়া স্বাভাবিক হলেও অতিরিক্ত কমে গেলে তা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

গভীর ঘুম এমন একটি পর্যায়, যখন শরীর ও মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি বিশ্রাম পায়। এই সময়ে হৃদস্পন্দন ধীর হয়ে আসে, শরীর ক্ষয়পূরণের কাজ করে এবং মস্তিষ্ক নিজেকে পুনর্গঠনের সুযোগ পায়। তাই সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য গভীর ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্কে জমে থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার হওয়ার প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে। একই সঙ্গে ডিমেনশিয়া ও আলঝাইমার্সের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ক্ষতিকর প্রোটিনও অপসারণে সহায়তা করে এই ঘুমের ধাপ।

যদি এসব ক্ষতিকর প্রোটিন দীর্ঘ সময় ধরে মস্তিষ্কে জমে থাকে, তাহলে স্মৃতিশক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। ভবিষ্যতে আলঝাইমার্সসহ বিভিন্ন ধরনের স্মৃতিভ্রংশজনিত রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।

গবেষণাটি পরিচালনা করতে ৬০ বছরের বেশি বয়সি ৩৪৬ জন অংশগ্রহণকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে তাঁদের দুই দফা রাতভর ঘুমের পরীক্ষা করা হয়, যাতে ঘুমের বিভিন্ন ধাপ বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়।

এরপর প্রায় ১৭ বছর ধরে তাঁদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকরা। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে ৫২ জন অংশগ্রহণকারীর ডিমেনশিয়া শনাক্ত হয়। এরপর গবেষকরা ঘুমের মান এবং রোগের ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন।

বিশ্লেষণে বয়স, লিঙ্গ, ধূমপানের অভ্যাস, ব্যবহৃত ওষুধ এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়। তারপরও দেখা যায়, প্রতি বছর গভীর ঘুম ১ শতাংশ কমে গেলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

গবেষণার প্রধান গবেষক অস্ট্রেলিয়ার মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের টার্নার ইনস্টিটিউট ফর ব্রেন অ্যান্ড মেন্টাল হেলথের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ পাসে বলেন, গভীর ঘুম বার্ধক্যজনিত মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি ক্ষতিকর প্রোটিন অপসারণেও সহায়ক হতে পারে।

তাঁর মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে যাওয়া স্বাভাবিক হলেও সেটি যদি দ্রুত কমতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ঘুমের মানের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গভীর ঘুম নিশ্চিত করতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। এতে শরীরের জৈবিক ঘড়ি ঠিক থাকে এবং ভালো ঘুম হতে সাহায্য করে।

এ ছাড়া মদ্যপান এড়িয়ে চলা, শোয়ার ঘর ঠান্ডা, শান্ত ও অন্ধকার রাখা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ঘুমের সময় শ্বাসকষ্ট বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে শুধু পর্যাপ্ত সময় ঘুমালেই হবে না, ঘুম কতটা গভীর হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভালো ও গভীর ঘুম শুধু শরীরকে বিশ্রাম দেয় না, দীর্ঘদিন মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জনপ্রিয় সংবাদ

গভীর ঘুম কমলেই বাড়তে পারে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি, নতুন গবেষণার সতর্কবার্তা

Update Time : ০৯:২৩:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে গেলে ৬০ বছরের বেশি বয়সিদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকদের দাবি, প্রতি বছর গভীর ঘুম মাত্র ১ শতাংশ কমে গেলেই ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে শুধু ঘুমের সময় নয়, ঘুমের মানের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর ঘুমের অভাব দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী জামা নিউরোলজি-তে। গবেষকদের মতে, বয়সের সঙ্গে গভীর ঘুম কিছুটা কমে যাওয়া স্বাভাবিক হলেও অতিরিক্ত কমে গেলে তা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

গভীর ঘুম এমন একটি পর্যায়, যখন শরীর ও মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি বিশ্রাম পায়। এই সময়ে হৃদস্পন্দন ধীর হয়ে আসে, শরীর ক্ষয়পূরণের কাজ করে এবং মস্তিষ্ক নিজেকে পুনর্গঠনের সুযোগ পায়। তাই সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য গভীর ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন  গ্রীষ্মে ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন সচেতনতা, কোন শারীরিক সমস্যায় কোন ফল এড়িয়ে চলবেন

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্কে জমে থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার হওয়ার প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে। একই সঙ্গে ডিমেনশিয়া ও আলঝাইমার্সের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ক্ষতিকর প্রোটিনও অপসারণে সহায়তা করে এই ঘুমের ধাপ।

যদি এসব ক্ষতিকর প্রোটিন দীর্ঘ সময় ধরে মস্তিষ্কে জমে থাকে, তাহলে স্মৃতিশক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। ভবিষ্যতে আলঝাইমার্সসহ বিভিন্ন ধরনের স্মৃতিভ্রংশজনিত রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।

গবেষণাটি পরিচালনা করতে ৬০ বছরের বেশি বয়সি ৩৪৬ জন অংশগ্রহণকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে তাঁদের দুই দফা রাতভর ঘুমের পরীক্ষা করা হয়, যাতে ঘুমের বিভিন্ন ধাপ বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন  অফিসে ক্লান্তি দূর করবে মাত্র ৫ মিনিটের এই অভ্যাস

এরপর প্রায় ১৭ বছর ধরে তাঁদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকরা। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে ৫২ জন অংশগ্রহণকারীর ডিমেনশিয়া শনাক্ত হয়। এরপর গবেষকরা ঘুমের মান এবং রোগের ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন।

বিশ্লেষণে বয়স, লিঙ্গ, ধূমপানের অভ্যাস, ব্যবহৃত ওষুধ এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়। তারপরও দেখা যায়, প্রতি বছর গভীর ঘুম ১ শতাংশ কমে গেলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

গবেষণার প্রধান গবেষক অস্ট্রেলিয়ার মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের টার্নার ইনস্টিটিউট ফর ব্রেন অ্যান্ড মেন্টাল হেলথের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ পাসে বলেন, গভীর ঘুম বার্ধক্যজনিত মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি ক্ষতিকর প্রোটিন অপসারণেও সহায়ক হতে পারে।

তাঁর মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে যাওয়া স্বাভাবিক হলেও সেটি যদি দ্রুত কমতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ঘুমের মানের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন  রাতে দুধের সঙ্গে এক চামচ মধু, সকালে দেখুন শরীরের চমকপ্রদ পরিবর্তন

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গভীর ঘুম নিশ্চিত করতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। এতে শরীরের জৈবিক ঘড়ি ঠিক থাকে এবং ভালো ঘুম হতে সাহায্য করে।

এ ছাড়া মদ্যপান এড়িয়ে চলা, শোয়ার ঘর ঠান্ডা, শান্ত ও অন্ধকার রাখা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ঘুমের সময় শ্বাসকষ্ট বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে শুধু পর্যাপ্ত সময় ঘুমালেই হবে না, ঘুম কতটা গভীর হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভালো ও গভীর ঘুম শুধু শরীরকে বিশ্রাম দেয় না, দীর্ঘদিন মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।