ঢাকা ০১:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৬ বছরে ৬,৪০৪ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ, ‘রক্তদানে আমরা কেন্দুয়া’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

রক্তদানে আমরা কেন্দুয়া আজ শুধু একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নাম নয়, এটি মানবতার সেবায় নিবেদিত একটি আস্থার প্ল্যাটফর্ম। ২০১৯ সালে কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি গত ছয় বছরে ৬ হাজার ৪০৪ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ করে অসংখ্য মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠনটির সদস্য, রক্তদাতা, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতীয় সংগীত পরিবেশন, কোরআন তেলাওয়াত ও কেক কাটার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় অতিথিরা স্বেচ্ছায় রক্তদানের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার রোগী দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, প্রসূতি, থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার ও অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য রক্তের ওপর নির্ভরশীল। এমন বাস্তবতায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সংগঠনের নেতারা জানান, শুরুতে মাত্র কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে শতাধিক সক্রিয় সদস্য নিয়মিত রক্তদাতা সংগ্রহ, রোগীর জন্য রক্ত নিশ্চিত করা এবং নতুন রক্তদাতা তৈরি করতে কাজ করছেন। শুধু কেন্দুয়া নয়, নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং প্রয়োজনে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও জরুরি ভিত্তিতে রক্তদাতা খুঁজে দেওয়ার সেবা দিয়ে আসছে সংগঠনটি।

সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে ৬ হাজার ৪০৪ ব্যাগ রক্ত সরবরাহের পাশাপাশি হাজারো মানুষকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত রক্তদাতাদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। ফলে গভীর রাত কিংবা ছুটির দিনেও জরুরি মুহূর্তে অনেক রোগী সময়মতো রক্ত পেয়ে জীবন ফিরে পেয়েছেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছায় রক্তদানের বিকল্প নেই। একজন সুস্থ মানুষ মাত্র ৩ থেকে ৪ মাস পরপর রক্ত দিতে পারেন এবং এতে তার স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং মানবিক একটি কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাই তরুণদের পাশাপাশি সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়মিত রক্তদানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে নিয়মিত রক্তদাতা, সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবক এবং সংগঠনের কার্যক্রমে বিশেষ অবদান রাখা কয়েকজন সদস্যকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। অতিথিরা বলেন, এমন স্বীকৃতি ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষকে মানবিক কাজে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত চিকিৎসকরা বলেন, দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য রোগীর রক্তের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশু, প্রসূতি মা, ক্যানসার রোগী এবং বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের রোগীদের জন্য নিয়মিত রক্তের চাহিদা থাকে। এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠনগুলো স্বাস্থ্যখাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা জানান, ভবিষ্যতে তারা শুধুমাত্র রক্ত সরবরাহেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। প্রতিটি ইউনিয়নে রক্তদাতা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, ব্লাড গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্প পরিচালনা, স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি, থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তায় আরও বিস্তৃতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে একটি আধুনিক ডিজিটাল রক্তদাতা ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এতে রোগীর স্বজনরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নির্দিষ্ট গ্রুপের রক্তদাতার তথ্য পেয়ে যাবেন। পাশাপাশি নতুন রক্তদাতাদের নিবন্ধন কার্যক্রমও আরও সহজ করা হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, ‘রক্তদানে আমরা কেন্দুয়া’ এখন শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি একটি মানবিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে বিনা স্বার্থে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে সংস্কৃতি সংগঠনটি তৈরি করেছে, তা দেশের অন্যান্য এলাকাতেও অনুসরণ করা যেতে পারে।

অনুষ্ঠানের শেষপর্বে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে অনেক নতুন রক্তদাতা প্রথমবারের মতো রক্ত দেন। পাশাপাশি উপস্থিত সবাই নিরাপদ রক্তদান, মানবসেবা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। বক্তারা বলেন, একজন মানুষের দেওয়া এক ব্যাগ রক্ত আরেকজন মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। তাই মানবতার সেবায় নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার আহ্বান জানান তারা।

জনপ্রিয় সংবাদ

৬ বছরে ৬,৪০৪ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ, ‘রক্তদানে আমরা কেন্দুয়া’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

Update Time : ১১:১০:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

রক্তদানে আমরা কেন্দুয়া আজ শুধু একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নাম নয়, এটি মানবতার সেবায় নিবেদিত একটি আস্থার প্ল্যাটফর্ম। ২০১৯ সালে কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি গত ছয় বছরে ৬ হাজার ৪০৪ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ করে অসংখ্য মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠনটির সদস্য, রক্তদাতা, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতীয় সংগীত পরিবেশন, কোরআন তেলাওয়াত ও কেক কাটার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় অতিথিরা স্বেচ্ছায় রক্তদানের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার রোগী দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, প্রসূতি, থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার ও অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য রক্তের ওপর নির্ভরশীল। এমন বাস্তবতায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সংগঠনের নেতারা জানান, শুরুতে মাত্র কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে শতাধিক সক্রিয় সদস্য নিয়মিত রক্তদাতা সংগ্রহ, রোগীর জন্য রক্ত নিশ্চিত করা এবং নতুন রক্তদাতা তৈরি করতে কাজ করছেন। শুধু কেন্দুয়া নয়, নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং প্রয়োজনে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও জরুরি ভিত্তিতে রক্তদাতা খুঁজে দেওয়ার সেবা দিয়ে আসছে সংগঠনটি।

আরও পড়ুন  ফ্যামিলি কার্ড কবে থেকে শুরু? জানালেন প্রধানমন্ত্রী

সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে ৬ হাজার ৪০৪ ব্যাগ রক্ত সরবরাহের পাশাপাশি হাজারো মানুষকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত রক্তদাতাদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। ফলে গভীর রাত কিংবা ছুটির দিনেও জরুরি মুহূর্তে অনেক রোগী সময়মতো রক্ত পেয়ে জীবন ফিরে পেয়েছেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছায় রক্তদানের বিকল্প নেই। একজন সুস্থ মানুষ মাত্র ৩ থেকে ৪ মাস পরপর রক্ত দিতে পারেন এবং এতে তার স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং মানবিক একটি কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাই তরুণদের পাশাপাশি সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়মিত রক্তদানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।

আরও পড়ুন  চিনিমুক্ত ফুল-ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে নিয়মিত রক্তদাতা, সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবক এবং সংগঠনের কার্যক্রমে বিশেষ অবদান রাখা কয়েকজন সদস্যকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। অতিথিরা বলেন, এমন স্বীকৃতি ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষকে মানবিক কাজে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত চিকিৎসকরা বলেন, দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য রোগীর রক্তের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশু, প্রসূতি মা, ক্যানসার রোগী এবং বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের রোগীদের জন্য নিয়মিত রক্তের চাহিদা থাকে। এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠনগুলো স্বাস্থ্যখাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা জানান, ভবিষ্যতে তারা শুধুমাত্র রক্ত সরবরাহেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। প্রতিটি ইউনিয়নে রক্তদাতা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, ব্লাড গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্প পরিচালনা, স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি, থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জরুরি চিকিৎসা সহায়তায় আরও বিস্তৃতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আরও পড়ুন  ডেঙ্গু চিকিৎসা সহজ করতে বেসরকারি হাসপাতালে বড় ছাড়ের প্রস্তাব

অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে একটি আধুনিক ডিজিটাল রক্তদাতা ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এতে রোগীর স্বজনরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নির্দিষ্ট গ্রুপের রক্তদাতার তথ্য পেয়ে যাবেন। পাশাপাশি নতুন রক্তদাতাদের নিবন্ধন কার্যক্রমও আরও সহজ করা হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, ‘রক্তদানে আমরা কেন্দুয়া’ এখন শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি একটি মানবিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে বিনা স্বার্থে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে সংস্কৃতি সংগঠনটি তৈরি করেছে, তা দেশের অন্যান্য এলাকাতেও অনুসরণ করা যেতে পারে।

অনুষ্ঠানের শেষপর্বে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে অনেক নতুন রক্তদাতা প্রথমবারের মতো রক্ত দেন। পাশাপাশি উপস্থিত সবাই নিরাপদ রক্তদান, মানবসেবা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। বক্তারা বলেন, একজন মানুষের দেওয়া এক ব্যাগ রক্ত আরেকজন মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। তাই মানবতার সেবায় নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার আহ্বান জানান তারা।