প্যাকেজ ভ্যাট বাতিল করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় স্বস্তির বার্তা দিয়েছে সরকার। খুচরা ব্যবসায়ীদের তীব্র বিরোধিতা এবং এসএমই (SME) খাতের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বহুল আলোচিত নির্দিষ্ট হারে মূল্য সংযোজন কর বা ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ আরোপের প্রস্তাব থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তামাক খাতে প্রস্তাবিত কয়েকটি কর বৃদ্ধির উদ্যোগও শিথিল করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নতুন বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে টার্নওভারের পরিমাণ যাই হোক না কেন, দেশের সব খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। অর্থাৎ আগে যেসব ছোট দোকান বা ব্যবসা ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে ছিল, তারাও বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করতে হতো। এই প্রস্তাব প্রকাশের পরই সারাদেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে বছরে ৫০ লাখ টাকা বা তার বেশি টার্নওভার রয়েছে—এমন খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হয়। এর নিচে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাট নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতার বাইরে রয়েছে। কিন্তু নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে এই সুবিধা আর থাকত না। এতে লাখো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অতিরিক্ত প্রশাসনিক জটিলতা ও ব্যয়ের মুখে পড়তেন।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, প্যাকেজ ভ্যাট চালু হলে ছোট ব্যবসার পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। শুধু তাই নয়, ভ্যাট নিবন্ধন, হিসাব সংরক্ষণ এবং নিয়মিত রিটার্ন জমা দেওয়ার মতো প্রক্রিয়া অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াত। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে ভ্যাট কর্মকর্তাদের হয়রানির আশঙ্কাও প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা।
এসএমই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় বাজারে পণ্য সরবরাহ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি হলে নতুন উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হতে পারেন এবং বাজারে বিনিয়োগও কমে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার ব্যবসায়ীদের মতামত গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। সরকারি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ বিলটি আইন হিসেবে পাস হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট বিধান বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে প্রস্তাবিত বাধ্যতামূলক ভ্যাট নিবন্ধনের বিষয়টি আর থাকছে না বলে জানা গেছে।
শুধু খুচরা ব্যবসাই নয়, তামাক শিল্প সম্পর্কিত কয়েকটি কর বৃদ্ধির প্রস্তাবেও পরিবর্তন আসছে। আমদানি পর্যায়ে নিকোটিন পাউচের ওপর ৩৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বর্তমানে যে হারে রয়েছে, সেটিই বহাল রাখা হতে পারে। এছাড়া প্রচলিত সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত অতিরিক্ত কর বৃদ্ধিও প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ছোট ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে করের চাপ বাড়ানোর পরিবর্তে ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর আদায় বাড়াতে শুধু নতুন কর আরোপ নয়, বরং কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা জরুরি। এতে একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়বে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও স্বেচ্ছায় কর ব্যবস্থার আওতায় আসতে উৎসাহিত হবেন।
সব মিলিয়ে প্যাকেজ ভ্যাট বাতিল করার সিদ্ধান্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থ বিল চূড়ান্তভাবে পাস হওয়ার পর সংশোধিত বিধান কার্যকর হলে লাখো খুচরা ব্যবসায়ী আগের নিয়মেই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।



























