যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদা (টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস বা টিপিএস) পাওয়া হাজারো অভিবাসীর ভবিষ্যৎ নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির ধারাবাহিকতায় সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের পর হোমল্যান্ড সিকিউরিটিবিষয়ক মন্ত্রী মার্কওয়েন মোলেন বলেছেন, টিপিএসধারীদের হয় স্থায়ী বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে, নয়তো নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।
রোববার সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোলেন বলেন, অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদা কখনোই স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি নয়। তাই যাঁরা যোগ্য, তাঁদের বৈধ স্থায়ী মর্যাদা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া উচিত। অন্যথায় সরকার তাঁদের দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে।
তিনি জানান, স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে আগ্রহীদের জন্য উড়োজাহাজের টিকিটের পাশাপাশি নতুনভাবে জীবন শুরু করতে প্রায় ২ হাজার ১০০ মার্কিন ডলার সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, টিপিএসের উদ্দেশ্য সাময়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থায়ী অভিবাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা নয়।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বিভক্ত এক রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে হাইতি ও সিরিয়ার শত শত অভিবাসীর টিপিএস বাতিলের পথ খুলে দেয়। এতদিন এই মর্যাদার কারণে তাঁরা যুদ্ধ, সহিংসতা ও দুর্যোগকবলিত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো থেকে সুরক্ষা পেয়ে আসছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনের আওতায় যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য বড় সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের নাগরিকদের সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজের অনুমতি দেওয়া হয়। অতীতে এই সুরক্ষা নিয়মিত নবায়ন করা হলেও বর্তমান প্রশাসন তা সীমিত করার নীতি গ্রহণ করেছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এখনো হাইতি ও সিরিয়ায় ভ্রমণের বিরুদ্ধে সতর্কতা জারি রেখেছে। দেশ দুটি এখনো ব্যাপক সহিংসতা, অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ এবং অপহরণের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সরকারি সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর প্রথম হাইতির নাগরিকদের জন্য টিপিএস চালু করা হয়। পরে ২০১২ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরু হলে দেশটির নাগরিকদেরও একই সুবিধা দেওয়া হয়। ফলে বহু মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য গণনির্বাসন পরিকল্পনা শুধু বিরোধী দল নয়, রিপাবলিকান দলের ভেতর থেকেও সমালোচনার মুখে পড়েছে। ওহাইওর গভর্নর মাইক ডিওয়াইন বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাইতিয়ানদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো নিরাপদ নয় এবং এটি অঙ্গরাজ্যের অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর হবে।
তিনি বলেন, ওহাইওর স্বাস্থ্যসেবা খাতে বহু হাইতিয়ান কর্মী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অনেকে বয়স্ক ও আলঝেইমারে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। একযোগে এসব কর্মীকে সরিয়ে নিলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প ওহাইওতে বসবাসরত হাইতিয়ানদের বিরুদ্ধে বিতর্কিত ও ভিত্তিহীন মন্তব্য করেছিলেন। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পোত্তর অর্থনৈতিক মন্দায় থাকা ওহাইওর বিভিন্ন এলাকায় হাইতিয়ান অভিবাসীরা নতুন কর্মসংস্থান, মজুরি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতিকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, সংঘাত ও দুর্যোগে আক্রান্ত দেশে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো মানবিক সংকট আরও গভীর করতে পারে।


























