চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় সংগীত প্রতিযোগিতা ‘সেরাকণ্ঠ’-এর চ্যাম্পিয়ন মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধ এবার নতুন পরিচয়ে আলোচনায় এসেছেন। ৪৭তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। মেধাতালিকায় দেশের প্রথম ৫০ জনের মধ্যে স্থান করে নিয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদে সুপারিশ পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসায় ভাসছেন এই বহুমুখী প্রতিভাবান তরুণ।
মঙ্গলবার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সুখবরটি সবার সঙ্গে ভাগ করে নেন মুগ্ধ। পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। ৪৭তম বিসিএস। প্রশাসন ক্যাডার। মেধাক্রমে দেশের প্রথম ৫০-এ স্থান করে নিয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদে সুপারিশপ্রাপ্তির সুসংবাদ জানাই সবাইকে।’ পোস্টটি প্রকাশের পর থেকেই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনের বন্যায় ভাসছেন তিনি।
একই পোস্টে এই সাফল্যের পেছনের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও সংগ্রামের কথাও তুলে ধরেন মুগ্ধ। তিনি জানান, ২০১৯ সাল থেকে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষকতার ব্যস্ততা, ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন তিনি।
মুগ্ধ লেখেন, ‘শত দায়িত্বের চাপ, সহস্র সংশয়, দোটানা। তারপরও অজস্র প্রশ্নোত্তরের খোঁজে ৪৭, সমুদ্র পাড়ি দেওয়া বান্দার শ্রমের প্রতিদান যিনি দিয়েছেন, সেই মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে লাখোকোটি শুকরিয়া।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কাজ করার যে আত্মতৃপ্তি তিনি পেয়েছেন, বিসিএসে সফল হওয়ার পরও সেই অনুভূতির মূল্য কমে যায়নি।
মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধর সাফল্যের গল্প মূলত শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকেই। স্কুলজীবনে তিনি পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করেন। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক—দুই পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি।
এরপর দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও মেধা ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
গানের পাশাপাশি গণিতেও অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন মুগ্ধ। ২০১২ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত ৫৩তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে ‘অনারেবল মেনশন’ অর্জন করেন। এছাড়া জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডে ছয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল কৃতিত্বও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পান ২০১০ সালে। ওই বছর চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে সারা দেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সংগীতের মঞ্চে তাঁর কণ্ঠ যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি শিক্ষাজীবনের সাফল্যও বারবার আলোচনায় এসেছে।
শুধু সংগীত বা গণিত নয়, উপস্থিত বক্তৃতা, রচনা, চিত্রাঙ্কন, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায়ও পুরস্কার জিতেছেন মুগ্ধ। বুয়েটে ভর্তি হওয়ার আগেই তাঁর ঝুলিতে ছিল ২৯টি জাতীয় পুরস্কার। বহুমাত্রিক প্রতিভার কারণে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন সবার নজরে।
খেলাধুলাতেও কম যাননি এই তরুণ। ২০০৮ সালে আন্তস্কুল টেবিল টেনিস ও বাস্কেটবল প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। লেখাপড়া, সংস্কৃতি এবং খেলাধুলা—সব ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতা দেখিয়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি।
ময়মনসিংহের চড়পাড়ায় জন্ম নেওয়া মুগ্ধর বাবা ইসকান্দর মির্জা একজন কলেজশিক্ষক এবং মা তাহমিনা বেগম স্বাস্থ্য পরিদর্শক। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় এবং তাঁর একজন যমজ ভাইও রয়েছেন। পরিবার থেকেই শিক্ষা ও শৃঙ্খলার পরিবেশ পেয়েছেন বলে ঘনিষ্ঠজনদের ধারণা।
গান, শিক্ষা, গবেষণা, গণিত, নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিগত অধ্যবসায়—সব মিলিয়ে মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধ এখন তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার একটি নাম। সেরাকণ্ঠের মঞ্চ থেকে শুরু হওয়া তাঁর যাত্রা এবার প্রশাসন ক্যাডারে নতুন দায়িত্বের মাধ্যমে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পৌঁছেছে। সততা, দক্ষতা ও জনসেবার প্রত্যয়ে নতুন দায়িত্ব পালন করবেন বলেই প্রত্যাশা তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের।
























