দেশের সব জেলাকে পর্যায়ক্রমে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৯টিতে রেল সংযোগ রয়েছে। অবশিষ্ট জেলাগুলোতেও ধাপে ধাপে রেললাইন সম্প্রসারণের মাধ্যমে জাতীয় রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ।
শুক্রবার (৪ জুলাই) রাতে নেত্রকোণা রেলস্টেশন পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য জানান। এর আগে তিনি জেলার মোহনগঞ্জ ও বারহাট্টা রেলস্টেশন পরিদর্শন করে চলমান কার্যক্রম এবং যাত্রীসেবার বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশের প্রতিটি অঞ্চলে আধুনিক ও নিরাপদ রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যেসব জেলায় এখনো রেল সংযোগ পৌঁছায়নি, সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
তিনি জানান, রেলপথ সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান রেল অবকাঠামোর আধুনিকায়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যাত্রীসেবা উন্নত করা, ভ্রমণের সময় কমানো এবং নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
সরকারি সফরের অংশ হিসেবে প্রতিমন্ত্রী দিনব্যাপী নেত্রকোণার বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি মদন উপজেলার উচিতপুর ট্রলারঘাটে পথসভায় যোগ দেন এবং মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
এ ছাড়া খালিয়াজুড়ি উপজেলার রোয়াইল-নাওটানা সংযোগস্থল, বাজোয়াইল কীর্তনখোলা ফিশারি এবং মোহনগঞ্জ উপজেলার বরান্তর চিরাডুবি হাওরে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচিতেও অংশ নেন। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা করেন তিনি।
সফরে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও নেত্রকোণা-৪ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।
হাবিবুর রশিদ বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সারা দেশে যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথ—সব ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি জানান, রেলপথে যানজট কমাতে ব্যস্ত এলাকাগুলোতে নতুন আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একদিকে সড়ক ও রেল যোগাযোগ আরও নিরাপদ হবে, অন্যদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
রেলসেবাকে আধুনিক করতে ট্রেনে ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। যাত্রীদের ভ্রমণকে আরও আরামদায়ক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ধাপে ধাপে বিভিন্ন ট্রেনে ডিজিটাল সুবিধা যুক্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ড লাইন নির্মাণের মাধ্যমে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে যাতায়াতের দূরত্ব ও সময় কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন উভয় ক্ষেত্রেই গতি বাড়বে।
নেত্রকোণার স্থানীয় উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জেলার বিভিন্ন দাবিদাওয়া সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রকল্পের অগ্রাধিকারের কারণে সব কাজ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানান, অতীতে বিভিন্ন স্থানে নতুন রেললাইন নির্মাণ হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহ করা হয়নি। এর ফলে বর্তমানে অনেক রুটে ট্রেন পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে মিটারগেজ রুটে ইঞ্জিন ও বগির সংকট রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। এই সংকট দূর করতে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ধাপে ধাপে রেল বহরে নতুন সংযোজন করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা সম্ভব হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ হবে, পণ্য পরিবহন ব্যয় কমবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে পর্যটন, শিল্প ও কৃষি খাতও নতুন গতি পাবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী রেল যোগাযোগের বিস্তার ঘটলে রাজধানীকেন্দ্রিক চাপও কিছুটা কমবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ দ্রুত ও নিরাপদে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন এবং জাতীয় উন্নয়নে রেলপথ আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকারের চলমান উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরে দেশের রেল যোগাযোগে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত যাত্রীসেবা এবং নতুন রেল সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে।





























