মানুষের মতো পশুপাখিদের জীবনেও দেখা যায় সম্পর্কের ভাঙন, সঙ্গী বদল এবং গোপন সম্পর্ক। গবেষণায় দেখা গেছে, একসঙ্গে বাসা বাঁধা বা দীর্ঘদিন জুটি হিসেবে থাকা প্রাণীদের মধ্যেও সব সময় বিশ্বস্ততা বজায় থাকে না। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রজনন কৌশল এবং পরিবেশগত চাপের কারণে কিছু প্রাণীর সম্পর্ক ভেঙে যায়। এমনকি শত বছরের বেশি সময় একসঙ্গে থাকার পরও বিচ্ছেদ ঘটেছে কচ্ছপের মতো দীর্ঘজীবী প্রাণীর।

প্রাণীজগতে সঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকার প্রবণতাকে বলা হয় ‘সামাজিক একগামিতা’। এর অর্থ হলো, দুটি প্রাণী নির্দিষ্ট সময় বা দীর্ঘ সময়ের জন্য জুটি গঠন করে এবং একসঙ্গে সন্তান লালন-পালনে অংশ নেয়। তবে সামাজিক একগামিতা মানেই যৌন বিশ্বস্ততা নয়। অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রে জুটি অটুট থাকলেও অন্য সঙ্গীর সঙ্গে প্রজননের ঘটনা দেখা যায়।

শতবর্ষী কচ্ছপের সম্পর্কেও বিচ্ছেদ

প্রাণীদের সম্পর্ক ভাঙার আলোচিত উদাহরণ হলো অস্ট্রিয়ার একটি চিড়িয়াখানার দুই গালাপাগোস কচ্ছপ বিবি ও পোলডি। প্রায় ১১৫ বছর একসঙ্গে থাকার পর ২০১১ সালে বিবি তার সঙ্গী পোলডিকে আক্রমণ করতে শুরু করে। এরপর তাদের একসঙ্গে রাখার চেষ্টা করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের নানা উদ্যোগেও তাদের সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত আলাদা করে রাখা হয় দুই কচ্ছপকে। দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কের অবসান প্রাণীদের সামাজিক আচরণ নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।

স্তন্যপায়ীদের তুলনায় পাখিদের জুটি বেশি

প্রাণীদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী জুটি গঠনের প্রবণতা সব প্রজাতিতে সমান নয়। স্তন্যপায়ীদের তুলনায় পাখিদের মধ্যে সামাজিক একগামিতা বেশি দেখা যায়। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সন্তান লালন-পালনে দুই সঙ্গীর ভূমিকা। অনেক পাখির ক্ষেত্রে পুরুষ ও স্ত্রী উভয়েই খাবার সংগ্রহ, বাসা রক্ষা এবং ছানাদের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব ভাগ করে নেয়।

অন্যদিকে, অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে গর্ভধারণ ও সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর দায়িত্ব প্রধানত মায়ের ওপর থাকে। ফলে পুরুষ সঙ্গীর দীর্ঘ সময় সঙ্গে থাকার প্রয়োজনীয়তা কিছু প্রজাতিতে তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে প্রাণীদের সম্পর্কের ধরন নির্ভর করে তাদের প্রজাতি, পরিবেশ ও প্রজনন কৌশলের ওপর।

পাখিদের বাসার বাইরেও থাকে গোপন সম্পর্ক

পাখিদের জুটি গঠন করলেই যে তাদের মধ্যে সম্পূর্ণ যৌন বিশ্বস্ততা থাকে, এমন নয়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষকেরা জানতে পেরেছেন, অনেক ক্ষেত্রে বাসার ছানার জৈবিক বাবা বাসায় থাকা পুরুষ পাখিটি নয়। অন্য কোনো পুরুষ পাখির সঙ্গে প্রজননের ফলে এসব ছানার জন্ম হতে পারে।

জীববিজ্ঞানে এ ধরনের ঘটনাকে ‘অতিরিক্ত-জুটি প্রজনন’ বলা হয়। অস্ট্রেলিয়ার ম্যাগপাইসহ বিভিন্ন পাখির প্রজাতিতে এমন আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এর হার প্রজাতিভেদে আলাদা। তাই নির্দিষ্ট কোনো প্রজাতিতে এ ধরনের ঘটনার হার উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গবেষণার তথ্য যাচাই করা জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনেও ভাঙতে পারে প্রাণীদের জুটি

প্রাণীদের সম্পর্কের ওপর পরিবেশের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। অ্যান্টার্কটিকার স্নো পেট্রেল পাখিরা অতিরিক্ত তুষারপাতের কারণে বাসা ও ডিম রক্ষায় সমস্যায় পড়তে পারে। প্রজননের পরিবেশ প্রতিকূল হয়ে উঠলে সঙ্গীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে এবং তাদের জুটি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

একইভাবে, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ব্ল্যাক-ব্রাউড আলবাট্রস পাখিদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় সমুদ্রের পানির তাপমাত্রার সঙ্গে জুটি ভাঙার সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিকূল পরিবেশে খাবার সংগ্রহ ও সন্তান লালন-পালনের চাপ বাড়তে পারে। গবেষকেরা এ ধরনের ঘটনাকে পরিবেশগত কারণে জুটি ভেঙে যাওয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

দীর্ঘায়ু প্রাণীদের সম্পর্ক টেকে বেশি দিন

প্রাণীদের আয়ু ও প্রজনন কৌশলও তাদের সম্পর্কের স্থায়িত্বে ভূমিকা রাখে। দীর্ঘজীবী পাখি, যেমন ওয়ান্ডারিং আলবাট্রস, অনেক সময় একই সঙ্গীর সঙ্গে বহু বছর ধরে প্রজনন করে। একসঙ্গে বাসা তৈরি, ডিমে তা দেওয়া এবং ছানাদের যত্ন নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের সফলভাবে সন্তান লালন-পালনে সহায়তা করে।

অন্যদিকে, যেসব প্রাণীর আয়ু তুলনামূলক কম, তাদের কিছু প্রজাতি একাধিক সঙ্গীর মাধ্যমে প্রজননের সুযোগ বাড়ানোর কৌশল অনুসরণ করে। তবে সব স্বল্পায়ু প্রাণী দ্রুত সঙ্গী বদলায়, এমন নয়। প্রতিটি প্রজাতির আচরণ নির্ধারিত হয় বিবর্তন, পরিবেশ এবং প্রজনন সাফল্যের মতো বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয়ে।

প্রাণীদের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা থেকে বোঝা যায়, তাদের সামাজিক জীবনও পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রভাবিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যের সংকট এবং প্রজননের অনুকূল পরিবেশ কমে যাওয়ার কারণে ভবিষ্যতে অনেক বন্যপ্রাণীর জুটি গঠন ও সন্তান লালন-পালনের ধরন বদলে যেতে পারে। এসব পরিবর্তন বুঝতে প্রাণীদের দীর্ঘমেয়াদি আচরণ পর্যবেক্ষণ করা জরুরি বলে মনে করছেন গবেষকেরা।