ঢাকা ০৮:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তদারকির অভাবে মৃত্যুফাঁদ চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্প

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৭:১৫:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫০২

সীতাকুণ্ডে চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্প। ছবি: সংগৃহীত

স্ক্র্যাপ লোহা জোগানের মাধ্যমে দেশের নির্মাণ খাতের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে সীতাকুণ্ড উপকূলের চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্প। তবে এই শিল্পের আড়ালে এখন আক্ষরিক অর্থেই এক ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদ তৈরি হয়েছে।

প্রতিদিন দৈত্যাকার সব জাহাজ কাটার শব্দ আর আগুনের স্ফুলিঙ্গের আড়ালে প্রতিনিয়ত পুড়ছে সাধারণ ও অসহায় শ্রমিকের জীবন। একের পর এক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে যখন ইয়ার্ডগুলো থেকে দগ্ধ মরদেহ বের হয়ে আসে, তখন একটি পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে—জাহাজে আগুন বা গ্যাসকাটার ব্যবহারের আগে ‘গ্যাসমুক্ত’ সনদ আসলে কীভাবে নেওয়া হয়েছিল?

অনুসন্ধানে জানা যায়, সমুদ্রসৈকতের ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ ভেড়ার পর সেটি কাটার প্রধান পূর্বশর্ত হলো ‘গ্যাস ফ্রি ফর হট ওয়ার্ক’ বা উত্তপ্ত কাজের উপযোগী সনদপত্র সংগ্রহ করা। নিয়ম অনুযায়ী, জাহাজের ফুয়েল ট্যাংক বা আবদ্ধ জায়গাগুলো থেকে দাহ্য গ্যাস ও তেলের অবশিষ্টাংশ পুরোপুরি নিষ্কাশন করা হয়েছে কি না, তা পরিদর্শকের সশরীরে পরীক্ষা করার কথা।

সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে গ্যাস লিকেজের ঘটনায় নিহতের স্বজনদের আহাজারি
সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে গ্যাস লিকেজের ঘটনায় নিহতের স্বজনদের আহাজারি। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু বাস্তবে বহু ইয়ার্ডে পুরোনো ট্যাংকারের তলদেশে জমে থাকা ঘন হাইড্রোকার্বন ও স্লাজ পরিষ্কার না করেই তড়িঘড়ি করে ভাঙা শুরু হয়। যখনই সেখানে গ্যাসকাটারের আগুন লাগে, তখনই জমে থাকা বদ্ধ গ্যাস ভয়াবহ রূপ নিয়ে বিস্ফোরিত হয়, যা সনদের বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে।

চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্প সামগ্রিকভাবে তদারকির দায়িত্বে রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই), বিস্ফোরক অধিদপ্তর এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সেল। কিন্তু বাস্তবে সরকারি এই দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব এবং জনবল সংকট প্রকট।

ইয়ার্ডগুলোর আয়তনের তুলনায় পরিদর্শকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বা সময় না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই বেসরকারি পরীক্ষকদের দেওয়া কাগজের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ইয়ার্ড মালিকদের প্রভাব ও দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদে নিরাপত্তা যাচাইয়ের বিষয়টি কেবল অফিসের ফাইল চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

এই শিল্পে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ার পেছনে বড় একটি কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত ঠিকাদারি বা সাব-কন্ট্রাক্ট প্রথা। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ সরাসরি স্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের বদলে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে অদক্ষ শ্রমিক নিয়ে কাজ করাতে বেশি আগ্রহী। এই ঠিকা শ্রমিকদের বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি সম্পর্কে কোনো ধারণাই থাকে না।

উপযুক্ত রেসপিরেটরি মাস্ক, অগ্নিপ্রতিরোধী পোশাক কিংবা ন্যূনতম আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই সাধারণ সুতি কাপড় ও চটিজুতা পরে তাদের গভীর ট্যাংকে নামিয়ে দেওয়া হয়। কাজের পরিবেশ যে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, তা বুঝতে পারার আগেই যেকোনো আকস্মিক আগুনের শিখা তাদের জন্য নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়।

আন্তর্জাতিক চাপে বাংলাদেশ হংকং কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করলেও, বেশিরভাগ ইয়ার্ডেই ‘গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং’-এর অবকাঠামোগত পরিবর্তন অত্যন্ত ধীরগতির। তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে গুরুতর দগ্ধ শ্রমিকদের নিয়ে ছুটতে হয় দূরের হাসপাতালে। এরপর গঠিত তদন্ত কমিটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘শ্রমিকের অসাবধানতা’ বলে ইয়ার্ড মালিকদের দায়মুক্তি দেয়।

বাংলাদেশ শ্রম আইনের অধীনে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অঙ্কও অত্যন্ত নগণ্য হওয়ায় পরিবারগুলোকে নামমাত্র আর্থিক সহায়তায় আপস করতে বাধ্য করা হয়। এ বিষয়ে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু অভিযোগ করেন, দায়িত্বশীলরা সরেজমিনে না গিয়ে কেবল টাকা কামানোর উদ্দেশ্যে অফিসে বসেই ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ ভাঙার অনুমোদন দিয়ে দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের প্রধান এস এম সাখাওয়াত হোসেন অফিসে বসে সনদ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, পানির ট্যাংক তাদের পরিদর্শনের আওতায় পড়ে না। এই মৃত্যুচক্র থামাতে কাগুজে সনদের আড়ালে থাকা অনিয়ম বন্ধ করে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে রাসায়নিক পরীক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

জনপ্রিয় সংবাদ

তদারকির অভাবে মৃত্যুফাঁদ চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্প

Update Time : ০৭:১৫:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

স্ক্র্যাপ লোহা জোগানের মাধ্যমে দেশের নির্মাণ খাতের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে সীতাকুণ্ড উপকূলের চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্প। তবে এই শিল্পের আড়ালে এখন আক্ষরিক অর্থেই এক ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদ তৈরি হয়েছে।

প্রতিদিন দৈত্যাকার সব জাহাজ কাটার শব্দ আর আগুনের স্ফুলিঙ্গের আড়ালে প্রতিনিয়ত পুড়ছে সাধারণ ও অসহায় শ্রমিকের জীবন। একের পর এক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে যখন ইয়ার্ডগুলো থেকে দগ্ধ মরদেহ বের হয়ে আসে, তখন একটি পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে—জাহাজে আগুন বা গ্যাসকাটার ব্যবহারের আগে ‘গ্যাসমুক্ত’ সনদ আসলে কীভাবে নেওয়া হয়েছিল?

অনুসন্ধানে জানা যায়, সমুদ্রসৈকতের ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ ভেড়ার পর সেটি কাটার প্রধান পূর্বশর্ত হলো ‘গ্যাস ফ্রি ফর হট ওয়ার্ক’ বা উত্তপ্ত কাজের উপযোগী সনদপত্র সংগ্রহ করা। নিয়ম অনুযায়ী, জাহাজের ফুয়েল ট্যাংক বা আবদ্ধ জায়গাগুলো থেকে দাহ্য গ্যাস ও তেলের অবশিষ্টাংশ পুরোপুরি নিষ্কাশন করা হয়েছে কি না, তা পরিদর্শকের সশরীরে পরীক্ষা করার কথা।

আরও পড়ুন  চন্দনাইশে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের বর্ণাঢ্য উদ্বোধন
সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে গ্যাস লিকেজের ঘটনায় নিহতের স্বজনদের আহাজারি
সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে গ্যাস লিকেজের ঘটনায় নিহতের স্বজনদের আহাজারি। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু বাস্তবে বহু ইয়ার্ডে পুরোনো ট্যাংকারের তলদেশে জমে থাকা ঘন হাইড্রোকার্বন ও স্লাজ পরিষ্কার না করেই তড়িঘড়ি করে ভাঙা শুরু হয়। যখনই সেখানে গ্যাসকাটারের আগুন লাগে, তখনই জমে থাকা বদ্ধ গ্যাস ভয়াবহ রূপ নিয়ে বিস্ফোরিত হয়, যা সনদের বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে।

চট্টগ্রামের জাহাজভাঙা শিল্প সামগ্রিকভাবে তদারকির দায়িত্বে রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই), বিস্ফোরক অধিদপ্তর এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সেল। কিন্তু বাস্তবে সরকারি এই দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব এবং জনবল সংকট প্রকট।

ইয়ার্ডগুলোর আয়তনের তুলনায় পরিদর্শকদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বা সময় না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই বেসরকারি পরীক্ষকদের দেওয়া কাগজের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ইয়ার্ড মালিকদের প্রভাব ও দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদে নিরাপত্তা যাচাইয়ের বিষয়টি কেবল অফিসের ফাইল চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

আরও পড়ুন  টিস্যু কালচার চারা, দুর্দান্ত প্রযুক্তিতে বদলাচ্ছে বাণিজ্যিক কৃষি

এই শিল্পে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ার পেছনে বড় একটি কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত ঠিকাদারি বা সাব-কন্ট্রাক্ট প্রথা। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ সরাসরি স্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের বদলে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে অদক্ষ শ্রমিক নিয়ে কাজ করাতে বেশি আগ্রহী। এই ঠিকা শ্রমিকদের বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি সম্পর্কে কোনো ধারণাই থাকে না।

উপযুক্ত রেসপিরেটরি মাস্ক, অগ্নিপ্রতিরোধী পোশাক কিংবা ন্যূনতম আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই সাধারণ সুতি কাপড় ও চটিজুতা পরে তাদের গভীর ট্যাংকে নামিয়ে দেওয়া হয়। কাজের পরিবেশ যে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, তা বুঝতে পারার আগেই যেকোনো আকস্মিক আগুনের শিখা তাদের জন্য নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়।

আন্তর্জাতিক চাপে বাংলাদেশ হংকং কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করলেও, বেশিরভাগ ইয়ার্ডেই ‘গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং’-এর অবকাঠামোগত পরিবর্তন অত্যন্ত ধীরগতির। তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে গুরুতর দগ্ধ শ্রমিকদের নিয়ে ছুটতে হয় দূরের হাসপাতালে। এরপর গঠিত তদন্ত কমিটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘শ্রমিকের অসাবধানতা’ বলে ইয়ার্ড মালিকদের দায়মুক্তি দেয়।

আরও পড়ুন  বাংলালিংকের নিও পিএসপিকে ই-ওয়ালেটের লাইসেন্স দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ শ্রম আইনের অধীনে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অঙ্কও অত্যন্ত নগণ্য হওয়ায় পরিবারগুলোকে নামমাত্র আর্থিক সহায়তায় আপস করতে বাধ্য করা হয়। এ বিষয়ে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু অভিযোগ করেন, দায়িত্বশীলরা সরেজমিনে না গিয়ে কেবল টাকা কামানোর উদ্দেশ্যে অফিসে বসেই ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ ভাঙার অনুমোদন দিয়ে দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের প্রধান এস এম সাখাওয়াত হোসেন অফিসে বসে সনদ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, পানির ট্যাংক তাদের পরিদর্শনের আওতায় পড়ে না। এই মৃত্যুচক্র থামাতে কাগুজে সনদের আড়ালে থাকা অনিয়ম বন্ধ করে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে রাসায়নিক পরীক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।