গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও গ্যাস সংকট থেকে এখনো পুরোপুরি বের হতে পারেনি দেশের শিল্পখাত। কোথাও উৎপাদন আংশিকভাবে শুরু হলেও নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক গতি ফিরছে না। এর মধ্যে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিলের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি ব্যবসায়ও বাড়ছে অনিশ্চয়তা। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি ব্যাকআপের পরিকল্পনাও এখনই করা প্রয়োজন।
শিল্প খাতে বড় ধাক্কা শুরু হয় গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর। এর প্রভাবে গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয় এবং দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কমে যায়। গত সপ্তাহে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছিল যে অনেক কারখানাকে পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। শনিবার ভোর থেকে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও শিল্পাঞ্চলে গিয়ে এখনো আগের সমস্যার পুরো সমাধান দেখা যায়নি।
গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন কারখানায় একাধিকবার লোডশেডিং হওয়ায় উৎপাদনের নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে যাচ্ছে। শ্রমিকদের অনেক সময় আগেই ছুটি বা বিরতিতে পাঠাতে হচ্ছে। উৎপাদন সচল রাখতে কিছু প্রতিষ্ঠান ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে জেনারেটর চালাচ্ছে। এতে একদিকে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
গাজীপুর জেলা ও মহানগর এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার কারখানা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গ্যাস সংকটের কারণে এর মধ্যে গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে পোশাক শিল্পের ডায়িং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং বিভাগ। সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলেও একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। নরসিংদীতে একসময় প্রায় ৮০ শতাংশ টেক্সটাইল, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা বন্ধ ছিল বলে জানা গেছে। গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও অনেক প্রতিষ্ঠানকে এখনো বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
উৎপাদন কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রপ্তানি অর্ডারে। নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট দিতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের কেউ কেউ অর্ডার বাতিল করছেন। অনেক উদ্যোক্তাকে আবার দেরিতে পণ্য পাঠানোর কারণে জরিমানার মুখেও পড়তে হচ্ছে। শিল্প মালিকদের মতে, পোশাক উৎপাদন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কোনো একটি ধাপে কয়েক ঘণ্টার জন্য উৎপাদন বন্ধ হলেও পরবর্তী ধাপগুলোতে তার প্রভাব পড়ে। ফলে দৈনিক ২০ হাজার ইউনিট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা কোনো কারখানা গ্যাস সংকটে কয়েক হাজার ইউনিটের বেশি উৎপাদন করতে পারছে না।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে শুধু তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ালেই হবে না; ভবিষ্যতের জন্য স্থায়ী বিকল্পও তৈরি করতে হবে। বিকেএমইএ সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও শিল্পকারখানা টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শোয়েব হাসান শিল্পকারখানার বয়লার ও জেনারেটর কেনার জন্য কম সুদের ঋণের প্রস্তাব দিয়েছেন। উদ্যোক্তাদের মতে, বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা জরুরি। কারণ দেশের গ্যাসের মজুতও দ্রুত কমছে এবং উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ২০৩১ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।




























