মেটা শিশু গোপনীয়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বড় আইনি লড়াই শুরু হতে যাচ্ছে। শিশু ও কিশোরদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোম্পানিটি ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের একাধিক গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘন করেছে—এমন অভিযোগে ২৯টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বিচার কোম্পানিটির জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আইনি চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হতে পারে।
২০২৩ সালে করা মামলায় ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কসহ ২৯টি অঙ্গরাজ্য দাবি করেছে, মেটার বিভিন্ন ফিচার ও নকশা তরুণ ব্যবহারকারীদের দীর্ঘসময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার জন্য তৈরি। তাদের অভিযোগ, শিশুদের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়ে মেটা জানত, কিন্তু ব্যবসায়িক স্বার্থে বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।
অঙ্গরাজ্যগুলো শুধু বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাইছে না। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহার পদ্ধতিতেও বড় পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে তারা। এর মধ্যে রয়েছে কিশোরদের জন্য লাইক কাউন্ট বন্ধ করা, ইনফিনিট স্ক্রল সীমিত করা এবং অভিভাবকের পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা।
ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে কী পরিবর্তন চায় অঙ্গরাজ্যগুলো
মামলায় বেশ কিছু জনপ্রিয় ফিচার নিয়ে পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রস্তাব অনুযায়ী কিশোর ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে অভিভাবক যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
এ ছাড়া ব্যবহারকারীদের দীর্ঘসময় অ্যাপে ধরে রাখে এমন রিকমেন্ডেশন অ্যালগরিদমে পরিবর্তন, চেহারা পরিবর্তনকারী কিছু ইমেজ ফিল্টার সরানো এবং ভিডিওর অটোপ্লে বন্ধ করার দাবিও রয়েছে।
একই সঙ্গে কিশোরদের একাধিক অ্যাকাউন্ট তৈরি বন্ধ করা এবং নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যায় এমন পোস্ট বা স্টোরির ব্যবহার নিয়েও বিধিনিষেধ চাওয়া হয়েছে।
অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, এসব ফিচার ব্যবহারকারীদের বারবার অ্যাপে ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘসময় প্ল্যাটফর্মে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ঘন ঘন নোটিফিকেশনের মাধ্যমে তরুণদের মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
মেটার অবস্থান কী
অভিযোগগুলো অবশ্য মেটা সরাসরি অস্বীকার করেছে। কোম্পানিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় এবং প্রমাণের মাধ্যমে তরুণদের নিরাপত্তার বিষয়ে তাদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা তুলে ধরতে পারবে।
মামলাটির শুনানি হবে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান ফেডারেল বিচারক ইয়ভন গঞ্জালেজ রজার্সের আদালতে। প্রায় দুই দশকের বিচারিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। প্রযুক্তি খাতের বড় মামলায় তাঁর ভূমিকা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
নিউ মেক্সিকোতে আগের রায়েও বড় ধাক্কা
মেটার জন্য এই মামলার আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রায় এসেছে নিউ মেক্সিকোতে। সেখানে একটি আদালত কোম্পানিটিকে মোট ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার জরিমানা করে এবং তরুণ ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় বেশ কিছু পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়।
সেই রায়ের মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে লাইক কাউন্ট সরিয়ে নেওয়া, কিশোরদের নগ্ন ছবি পাঠানো বা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা এবং নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে পুশ নোটিফিকেশন সীমিত করার মতো নির্দেশ ছিল।
বিচারক ব্রায়ান বিডশিড মেটার কার্যক্রমকে ‘পাবলিক নিউসেন্স’ বা জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেন। মেটা ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে।
নিউ মেক্সিকোর রায় শুধু ওই অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রেই কার্যকর। কিন্তু ২৯ অঙ্গরাজ্যের নতুন মামলায় যদি মেটা হেরে যায়, তাহলে একই ধরনের পরিবর্তন পুরো যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর করার চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলো মিলিয়ে দেশটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে।
লাইক কাউন্ট নিয়েও প্রশ্ন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক এখন ব্যবহারকারীদের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বোঝার অন্যতম দৃশ্যমান মাপকাঠি। কিন্তু কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগ বেড়েছে।
মামলার নথিতে মেটার নিজস্ব গবেষণার কথাও উঠে এসেছে। সেখানে লাইক কাউন্টের সঙ্গে সামাজিক তুলনা বা অন্যের সঙ্গে নিজের মূল্যায়ন তুলনা করার প্রবণতার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল বলে অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে।
মেটার অভ্যন্তরীণ গবেষণায় ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক এই সামাজিক তুলনার সঙ্গে একাকিত্ব বৃদ্ধি, নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা এবং খারাপ মেজাজের সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কেন এত আলোচনা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের জন্য শুধু বিনোদনের জায়গা নয়। দীর্ঘসময় স্ক্রিনে থাকা, অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করা, জনপ্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ এবং বারবার নোটিফিকেশনের কারণে মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।
অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবি, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোতে এসব ঝুঁকি সম্পর্কে কোম্পানির কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল। তারপরও শিশু ও কিশোরদের আকৃষ্ট রাখতে এবং ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন ফিচার ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে মেটা বলছে, তরুণ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। ফলে এই মামলায় শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নকশা ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠছে।
মামলায় অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবি সফল হলে লাইক কাউন্ট, অটোপ্লে, ইনফিনিট স্ক্রল ও রিকমেন্ডেশন সিস্টেমের মতো বহু পরিচিত ফিচার তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য বদলে যেতে পারে। আর সেটি হলে যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।




























