নায়করাজ রাজ্জাকের জীবন যেন রুপালি পর্দার কোনো গল্পকেও হার মানায়। একসময় টেলিভিশনে অভিনয় করে সপ্তাহে মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ টাকা আয় করতেন তিনি। অথচ মাসে সংসার চালাতে প্রয়োজন হতো প্রায় ৬০০ টাকা। সন্তানদের দুধ কিনতেই আয়ের বড় অংশ চলে যেত। কখনো স্ত্রীকে নিয়ে উপোসও করতে হয়েছে। ফার্মগেট থেকে ডিআইটি টেলিভিশন কেন্দ্রে যাতায়াতের টাকাও না থাকায় হেঁটে যেতেন। সেই কঠিন সময় পেরিয়ে একদিন তিনিই হয়ে ওঠেন ঢালিউডের নায়করাজ রাজ্জাক।
১৯৬৪ সালে স্ত্রী ও আট মাসের সন্তানকে নিয়ে শূন্য হাতে ঢাকায় এসেছিলেন রাজ্জাক। পরিচিত কেউ ছিল না, থাকার নিশ্চয়তাও ছিল না। স্টেডিয়াম এলাকার একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসেই শুরু হয়েছিল তাঁর ঢাকার জীবন। সেই স্মৃতিকে প্রতীকীভাবে ধরে রেখেছে রাজলক্ষ্মী প্রতিষ্ঠানের লোগো। বড় ছেলে বাপ্পারাজ জানিয়েছেন, বাবার পরিকল্পনায় নির্মাতা ও শিল্পী সুভাষ দত্ত লোগোটির নকশা করেছিলেন। ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে থাকা সেই মানুষটিই পরে নিজের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উত্তরার একটি জায়গাকে ‘রাজলক্ষ্মী’ নামে পরিচিত করে তোলেন।
রাজ্জাকের অভিনয়ের শুরু অবশ্য কলকাতায়। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি টালিগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতার ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল খেলোয়াড় হওয়ার। তবে স্কুলের একটি মঞ্চনাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। পরে চলচ্চিত্রে ছোট চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। নায়ক হওয়ার স্বপ্নে ১৯৫৯ সালে মুম্বাইয়ে গিয়ে ফিল্মালয়ে অভিনয়ের প্রশিক্ষণও নেন। কিন্তু সেখানে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিতে পারেননি। টালিগঞ্জেও বুঝতে পেরেছিলেন, ছোট চরিত্রের গণ্ডি পেরোনো কঠিন। তবু স্বপ্ন ছাড়েননি।
ঢাকায় এসে রাজ্জাক প্রথমে টেলিভিশনে কাজ করেন এবং সংসারের কঠিন সময় পার করেন। স্ত্রী খায়রুন্নেসা, যিনি পরে ‘লক্ষ্মী’ নামে পরিচিত হন, ছিলেন তাঁর অন্যতম বড় শক্তি। রাজ্জাকের হাতে যখন অর্থ ছিল না, তখনও তিনি পাশে ছিলেন। ১৯৬৫ সালে ‘আখেরি স্টেশন’ সিনেমায় সহকারী স্টেশনমাস্টারের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ঢাকার চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এরপর ‘কার বউ’, ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’, ‘ডাকবাবু’সহ বিভিন্ন সিনেমায় ছোট চরিত্রে কাজ করেন। অবশেষে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবিতে নায়ক হওয়ার সুযোগ পান। ৫০০ টাকা সাইনিং মানি হাতে পেয়ে সেই আনন্দে তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন।
‘বেহুলা’ মুক্তির পর বদলে যায় রাজ্জাকের জীবন। ছবিটি দর্শকদের কাছে সাড়া ফেলে এবং নতুন নায়ক হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘নায়করাজ’ উপাধি। তবে নিজের সাফল্যকে কখনো একার অর্জন মনে করেননি তিনি। পরিচালক, সহশিল্পী, পরিবার ও দর্শকদের অবদান সবসময় স্মরণ করেছেন। জীবনের শেষভাগেও তাঁর স্মৃতিতে ছিল সেই সংগ্রামের দিনগুলো, যখন মেকআপ রুমের মেঝেতে ঘুমিয়ে পরদিন আবার শুটিংয়ে দাঁড়াতে হতো।
রাজ্জাকের মৃত্যুর পরও তাঁর স্মৃতি ছড়িয়ে আছে পরিবার ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মাঝে। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট তিনি মারা যান। গুলশান-২-এর লক্ষ্মীকুঞ্জে তাঁর ব্যবহৃত ঘর, পোশাক, পারফিউমসহ অনেক কিছুই আগের মতো রাখা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা এখনো তাঁর খালি চেয়ার দেখলে শূন্যতা অনুভব করেন। সন্তানদের কাছে বাবার সময়মতো ফোন করা, একসঙ্গে খাওয়া এবং পরামর্শ দেওয়ার স্মৃতিগুলো আজও অমলিন। শূন্য হাতে ঢাকায় আসা সেই তরুণের জীবন তাই শুধু একজন তারকার সাফল্যের গল্প নয়; এটি স্বপ্ন, সংগ্রাম, ভালোবাসা ও না-হারার এক অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়।























