একসময় মহাকাশযানের ক্যাপ্টেন, কখনো আবার অতিমানবদের শিক্ষক বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে কোটি দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। ‘স্টার ট্রেক’-এর ক্যাপ্টেন জ্যাঁ-লুক পিকার্ড এবং ‘এক্স-মেন’-এর প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার চরিত্রে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই ব্রিটিশ অভিনেতা আর নেই। ৮৬ বছর বয়সে মারা গেছেন তিনি।
গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আলঝেইমার রোগ ও লিউই বডি ডিমেনশিয়ার সঙ্গে লড়াই করছিলেন তিনি। শেষ সময়ে স্ত্রী সানি ওজেল তাঁর পাশে ছিলেন।
১৯৪০ সালের ১৩ জুলাই ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মিরফিল্ডে জন্ম প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের। শৈশব থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। বিশেষ করে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের নাটক তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।
অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর যুক্ত হন ব্রিটেনের বিখ্যাত রয়্যাল শেক্সপিয়ার কোম্পানিতে। মঞ্চে শেক্সপিয়ারের নানা চরিত্রে অভিনয় করে ধীরে ধীরে দক্ষ অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। ব্রিটিশ মঞ্চ থেকে পরে তাঁর অভিনয় ছড়িয়ে পড়ে ব্রডওয়ে ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রজগতে।
তবে বিশ্বজুড়ে দর্শকের কাছে তাঁর পরিচিতি আসে ১৯৮৭ সালে। ওই বছর শুরু হওয়া ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’ ধারাবাহিকে ক্যাপ্টেন জ্যাঁ-লুক পিকার্ডের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। তখন তাঁর বয়স ছিল ৪৭ বছর।
‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’ ধারাবাহিকটি ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সাত মৌসুমে প্রচারিত হয়। এতে পিকার্ডের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকের কাছে ব্যাপক প্রশংসা পায়। পরে ‘স্টার ট্রেক’-এর একাধিক চলচ্চিত্রেও একই চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২০ সালে ‘স্টার ট্রেক: পিকার্ড’ সিরিজের মাধ্যমে আবারও পরিচিত চরিত্রে ফিরে আসেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রচারিত সিরিজটিতে তাঁর অভিনয় পুরোনো ও নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে সমানভাবে আলোচিত হয়।
‘স্টার ট্রেক’-এর পাশাপাশি ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্র সিরিজও প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের জনপ্রিয়তার বড় অংশ। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম ‘এক্স-মেন’ ছবিতে প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। অতিমানবীয় ক্ষমতাসম্পন্ন মিউট্যান্টদের নেতা ও শিক্ষক হিসেবে এই চরিত্রটি সিরিজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে ‘এক্স-মেন’-এর আরও কয়েকটি ছবিতে তাঁকে দেখা যায়। ২০১৭ সালের ‘লোগান’ ছবিতেও অভিনয় করেন তিনি। এ ছাড়া মার্ভেলের আসন্ন ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’ চলচ্চিত্রেও তাঁর অভিনয়ের কথা জানানো হয়েছিল।
শুধু চলচ্চিত্র বা টেলিভিশন নয়, মঞ্চনাটকেও অসামান্য অবদান রেখেছেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। শেক্সপিয়ারের নাটকে অভিনয়ের জন্য বিশেষভাবে প্রশংসিত ছিলেন তিনি। তাঁর অভিনয়জীবন বিস্তৃত ছিল ব্রিটেনের মঞ্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রডওয়ে পর্যন্ত।
নাট্যজগতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর থেকে তাঁর নামের আগে যুক্ত হয় ‘স্যার’।
সহকর্মীদের শোক ও স্মৃতিচারণ
প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও হলিউডের তারকারা। ‘স্টার ট্রেক’-এর সহশিল্পী উইলিয়াম শ্যাটনার তাঁর প্রজ্ঞা, সৌজন্য ও মানবিকতার কথা স্মরণ করেছেন। ‘এক্স-মেন’ সহশিল্পী হিউ জ্যাকম্যানও তাঁকে মঞ্চ ও পর্দার অন্যতম সেরা অভিনেতা হিসেবে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
মার্ভেল স্টুডিওস এক বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার চরিত্রে প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের অভিনয় প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শকের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অভিনয়ের পাশাপাশি মানবাধিকার, পারিবারিক সহিংসতার শিকার মানুষ, শরণার্থী ও প্রাণিকল্যাণের পক্ষে কাজ করেছেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণও প্রশংসিত হয়েছে।
তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী সানি ওজেল এবং আগের সংসারের দুই সন্তান ড্যানিয়েল ও সোফিকে।
মঞ্চে শেক্সপিয়ারের চরিত্র, মহাকাশের অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ক্যাপ্টেন কিংবা অতিমানবদের শিক্ষক প্রতিটি ভূমিকায় নিজের অভিনয়দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবন ও স্মরণীয় চরিত্রগুলো ভক্তদের কাছে বেঁচে থাকবে।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন