১৯৯২ সালে যাত্রা শুরু করা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ শুধু বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবল লিগই নয়, রেকর্ডেরও এক বিশাল ভাণ্ডার। বছরের পর বছর অসংখ্য তারকা ও ক্লাব নিজেদের নাম ইতিহাসে লিখিয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ফুটবলের ধরন বদলেছে, প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং খেলোয়াড়দের ওপর চাপও বেড়েছে। ফলে কিছু প্রিমিয়ার লিগের রেকর্ড এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেগুলো ভবিষ্যতে ভাঙা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। ২১ আগস্ট থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন মৌসুমের আগে ফিরে দেখা যাক সেই অসাধারণ কীর্তিগুলো।
গোলের হিসাবে সবার ওপরে এখনো অ্যালান শিয়ারার। ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স ও নিউক্যাসল ইউনাইটেডের হয়ে তিনি করেছেন ২৬০ গোল। ২০০৬ সালে অবসর নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কেউ তার কাছাকাছি যেতে পারেননি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা হ্যারি কেইনের গোলসংখ্যা ২১৩। ফলে শিয়ারারের জায়গা দখল করতে হলে একজন স্ট্রাইকারকে বহু বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে গোল করে যেতে হবে। শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়, ঘরের মাঠেও চেলসির কীর্তি অবিশ্বাস্য। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে টানা ৮৬ ম্যাচ অপরাজিত ছিল তারা। এই প্রিমিয়ার লিগের রেকর্ড এখনো ঘরের মাঠে দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্যের অন্যতম বড় উদাহরণ।
দলীয় সাফল্যের কথা উঠলে ম্যানচেস্টার সিটির ১০০ পয়েন্টের মৌসুম আলাদা করে বলতে হয়। ২০১৭-১৮ মৌসুমে পেপ গার্দিওলার দল ৩৮ ম্যাচে ৩২ জয়, চার ড্র ও দুই হারে এই মাইলফলক স্পর্শ করে। তারা সেই মৌসুমে ১০৬ গোলও করেছিল। লিভারপুল ২০১৯-২০ মৌসুমে ৯৯ পয়েন্ট নিয়ে খুব কাছে পৌঁছালেও সিটির রেকর্ড অক্ষত রয়েছে। রক্ষণেও রয়েছে বিস্ময়কর কীর্তি। ২০০৪-০৫ মৌসুমে হোসে মরিনিওর চেলসি পুরো লিগে মাত্র ১৫ গোল হজম করেছিল। একই মৌসুমে পেত্র চেখ ২৪টি ক্লিন শিট নিয়ে গোলরক্ষকদের জন্যও তৈরি করেছিলেন অনন্য এক মানদণ্ড।
আর্সেনালের ২০০৩-০৪ মৌসুমও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়। আর্সেন ওয়েঙ্গারের দল পুরো ৩৮ ম্যাচে অপরাজিত থেকে লিগ শিরোপা জেতে। এই অসাধারণ যাত্রা শুধু একটি মৌসুমেই থামেনি; আগের ও পরের ম্যাচ মিলিয়ে তারা টানা ৪৯ ম্যাচ অপরাজিত ছিল। আরেকটি অবাক করা কীর্তি রয়েছে গোল করার ক্ষেত্রে। ২০০১ সালের মে থেকে ২০০২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আর্সেনাল টানা ৫৫টি প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচে অন্তত একটি গোল করেছিল। অর্থাৎ প্রায় দেড় বছর ধরে প্রতিটি লিগ ম্যাচে গোলের দেখা পেয়েছিল গানাররা। প্রিমিয়ার লিগের রেকর্ড হিসেবে এই ধারাবাহিকতা আজও অসাধারণ।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রক্ষণও লিখেছে আলাদা ইতিহাস। ২০০৮-০৯ মৌসুমে দলটি টানা ১৪টি প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচে গোল হজম করেনি। রিও ফার্দিনান্দ, নেমানিয়া ভিদিচ ও এডউইন ফন ডার সারদের নিয়ে গড়া সেই রক্ষণ প্রতিপক্ষের জন্য ছিল কঠিন দেয়াল। ফন ডার সার টানা ১ হাজার ৩১১ মিনিট গোল না খেয়ে ব্যক্তিগতভাবেও অসাধারণ কীর্তি গড়েছিলেন। খেলোয়াড়দের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রেও রয়েছে চমক। ২০২৫-২৬ মৌসুম শেষে অবসর নেওয়া জেমস মিলনার ৬৫৮ ম্যাচ খেলে প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ উপস্থিতির রেকর্ড নিজের করে রেখেছেন। ২৪ মৌসুমের এই দীর্ঘ যাত্রা এবং ধারাবাহিক ফিটনেসের কারণে তার রেকর্ডও সহজে ভাঙার মতো নয়।
এক ম্যাচে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটিও বেশ চমকপ্রদ। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে পোর্টসমাউথ ও রিডিংয়ের ম্যাচে মোট ১১ গোল হয়েছিল। পোর্টসমাউথ সেই ম্যাচ জিতেছিল ৭-৪ গোলে। প্রিমিয়ার লিগে এটিই এখন পর্যন্ত এক ম্যাচে সর্বোচ্চ গোলের সংখ্যা। এত গোলের ম্যাচ ফুটবলে বিরল, আর শীর্ষ পর্যায়ের লিগে এমন ঘটনা আরও কম দেখা যায়। তাই প্রিমিয়ার লিগের রেকর্ডগুলোর তালিকায় এই ম্যাচটিও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এসব রেকর্ড দেখলে বোঝা যায়, আধুনিক ফুটবলে প্রতিটি ম্যাচের প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বাড়ছে, দীর্ঘ সময় ধরে একই মান ধরে রাখা তত কঠিন হচ্ছে।
নতুন মৌসুমে হয়তো কোনো তরুণ তারকা বা নতুন কোনো দল পুরোনো রেকর্ড ভাঙার চ্যালেঞ্জ নেবে। কিন্তু শিয়ারারের ২৬০ গোল, চেলসির ৮৬ ম্যাচের অপরাজিত ঘরের মাঠ, সিটির ১০০ পয়েন্ট, আর্সেনালের ৪৯ ম্যাচের অপরাজিত ধারা কিংবা ৫৫ ম্যাচে গোল করার মতো কীর্তি ভাঙতে শুধু প্রতিভা নয়, প্রয়োজন হবে দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতা, অসাধারণ ফিটনেস এবং ভাগ্যের সহায়তা। তাই প্রিমিয়ার লিগের রেকর্ডগুলোর অনেকগুলো হয়তো আরও বহু বছর ধরে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। নতুন মৌসুমে রেকর্ড ভাঙার নতুন গল্প তৈরি হয় কি না, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।



























