হাতে মোবাইল ফোন কিংবা চাবি নিয়ে, গলায় গামছা ঝুলিয়ে ঘরের সবখানে এসব জিনিস খুঁজে বেড়ান-এমন মানুষের সংখ্যা আমাদের চারপাশে নেহাত কম নয়। ডিমেনশিয়া বা ভুলে যাওয়া শুধুই যে বেশি বয়সের মানুষদের সমস্যা, ধারণাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। বয়স্কদের পাশাপাশি ছোটরাও এই ভুলে যাওয়ার সমস্যায় ভোগে।
ভারতীয় নিউরোলজিস্ট অংশু সেনের মতে, বাচ্চাদের পড়া ভুলে যাওয়ার মূলে সাধারণত অমনোযোগ কাজ করে। কিন্তু বড়দের, বিশেষ করে বয়স্কদের ভুলে যাওয়ার পেছনে মস্তিষ্কের মারাত্মক অসুখ অ্যালজাইমার ডিজিজ বা পার্কিনসনস থাকতে পারে। আবার অনেক সময় দুর্ঘটনায় মাথায় তীব্র আঘাত লেগে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। ডাক্তারি পরিভাষায় স্মৃতি হারানোর এই অবস্থাকে ‘পোস্ট ট্রমাটিক অ্যামেনশিয়া’ বলা হয়। তবে সিনেমায় যেমনটা দেখা যায়-মাথায় আঘাত লাগা মাত্রই চেনা মানুষকে ভুলে যাওয়া বা কোনো পুরোনো গান শুনে স্মৃতি ফিরে পাওয়া, বাস্তবে এমন নাটকীয় ঘটনা বেশ বিরল।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অংশু সেন জানান, স্নায়ুতন্ত্রের প্রধান কেন্দ্র মস্তিষ্কের তিনটি মূল অংশ হলো- সেরিব্রাম, সেরিবেলাম এবং ব্রেন স্টেম। কোনো কিছু মনে রাখা বা না রাখা ছাড়াও একজন মানুষের যাবতীয় শারীরিক ও মানসিক কাজ মূলত এই ব্রেন বা মস্তিষ্ক থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।
মস্তিষ্কের সব থেকে বড় অংশ হলো সেরিব্রাম, যা মস্তিষ্কের মোট ওজনের ৮৫ শতাংশ ও আয়তনের ৭৫ শতাংশ দখল করে আছে। এই সেরিব্রামের দুটি হেমিস্ফিয়ার বা অংশ রয়েছে। পুরো সেরিব্রামটি সেরিব্রাল কর্টেক্স নামের এক বিশেষ আবরণী দিয়ে ঢাকা থাকে। মস্তিষ্কের এই গুরুত্বপূর্ণ আবরণ আমাদের ভাবনা-চিন্তা, বুদ্ধি, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
সেরিব্রাল কর্টেক্সের আবার চারটি লোব বা ভাগ রয়েছে। এদের মধ্যে অ্যামিগডালা ও হিপ্পোক্যাম্পাস অংশ মানুষকে যেকোনো কিছু মনে রাখতে সাহায্য করে। মূলত হিপ্পোক্যাম্পাস অংশেই স্নায়ুকোষ বা নিউরন তৈরি হয়। বিভিন্ন কারণে এই নিউরন তৈরির হার কমে গেলে মানুষের বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়াসহ শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন অসুবিধা দেখা দেয়।
যখনই ভুলে যাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে, তখন কালক্ষেপণ না করে অবশ্যই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া যারা দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতায় ভুগছেন, তাদের মনঃসংযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভুলে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
ভুলে যাওয়ার সমস্যা প্রতিরোধ করতে কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বংশে যদি অ্যালজাইমারস বা পার্কিনসন্সের মতো রোগের ইতিহাস থাকে, তবে ছোটবেলা থেকেই মন ভালো রাখতে গান শোনা কিংবা পছন্দের কোনো বাজনা বাজানো বা শোনার অভ্যাস তৈরি করতে হবে বলে পরামর্শ দিয়েছেন নিউরোলজিস্ট অংশু সেন। এছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম করে প্রতিদিন ‘সুডোকু’ খেলার অভ্যাস বিস্মৃতিকে পিছিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে।
স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ ও ধারালো রাখতে সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হিংসা, রাগ ও অকারণ ভয় ভুলে মন ভালো রাখতে নিজের জন্য প্রতিদিন কিছুটা একান্ত সময় বের করতে হবে। গান শোনা এবং গান গাওয়ার পাশাপাশি ভুলে যাওয়ার সমস্যা এড়াতে ধূমপান ও মদ্যপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাস পুরোপুরি ছাড়তে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় টাটকা শাকসবজি, ফল, মাছসহ পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার রাখলে ভুলে যাওয়ার সমস্যা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।



মন্তব্য
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
একটি মন্তব্য লিখুন