রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আজ। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে আবারও একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট শেষে সংসদ কক্ষেই ব্যালট গণনা করে ফল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। এরপর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির নামে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। দুই প্রার্থীর মনোনয়নই বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। সংসদে বিএনপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের জয়ের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
এই ভোটে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দিলে তার সদস্যপদ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। ফলে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ কার্যত সীমিত।
এবার মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। চট্টগ্রাম-৪ আসনটি শূন্য থাকায় সংসদের মোট আসন পূর্ণ নয়। এই ৩৪৯ ভোটারের মধ্যে বিএনপি ও তাদের জোটের ভোটসংখ্যা বড় ব্যবধানে বেশি। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটেরও একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংসদ সদস্য রয়েছে। এ কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ভোটের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা খুব বেশি নেই।
তবু এবারের নির্বাচনকে শুধু ফলাফলের হিসাব দিয়ে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয়নি। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল। সে সময় বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এরপর প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একক প্রার্থী থাকার প্রবণতাই দেখা গেছে।
এবার বিরোধী পক্ষের প্রার্থী দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদকে প্রার্থী করার বিষয়টি তাই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও সংসদীয় সংখ্যার হিসাবে তাদের জয় কঠিন, তবু নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে বিরোধী জোট। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতি বেছে নেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং দীর্ঘ বিরতির পর সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি ভোটের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
ভোটের প্রক্রিয়াও এবার বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে স্বাক্ষর করে তা নির্ধারিত বাক্সে জমা দেবেন। ভোটগ্রহণ শেষে সেখানেই গণনা করা হবে। এরপর ফলাফল ঘোষণা ও গেজেট প্রকাশের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করবে নির্বাচন কমিশন।
সব মিলিয়ে আজকের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একদিকে ৩৫ বছর পর একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণ, অন্যদিকে সংসদে ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা—দুই বাস্তবতা পাশাপাশি রয়েছে। তাই ভোটের ফল নিয়ে বড় ধরনের চমকের প্রত্যাশা না থাকলেও নির্বাচনটি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক চর্চার দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। জাতীয় সংসদে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচিত হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা কত দ্রুত সম্পন্ন হয়।



























