২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে এবার দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। শেষ ম্যাচের আগেই কয়েকটি দলের বিদায় নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে, যেখানে অতীতে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত টিকে থাকত নানা সমীকরণের উত্তেজনা। ফিফার নতুন নিয়মের কারণেই বদলে গেছে এতদিনের পরিচিত হিসাব-নিকাশ।
বিশ্বকাপ মানেই গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নাটকীয় সমীকরণ, গোল পার্থক্যের লড়াই এবং শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা। কিন্তু এবার অনেক দলকে সেই সুযোগও দিচ্ছে না নতুন নিয়ম। কারণ পয়েন্ট সমান হলে আগের মতো গোল পার্থক্য নয়, সবার আগে গুরুত্ব পাচ্ছে মুখোমুখি লড়াইয়ের ফল।
এই নিয়ম কার্যকর হওয়ায় ইতোমধ্যেই হাইতি, তুরস্ক ও তিউনিসিয়ার নকআউট পর্বে ওঠার আশা শেষ হয়ে গেছে। যদিও তাদের প্রত্যেকেরই এখনও একটি করে ম্যাচ বাকি রয়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো, শেষ ম্যাচ জিতলেও আর সামনে এগোনোর সুযোগ নেই।
এর আগে বিশ্বকাপে দুটি বা তার বেশি দলের পয়েন্ট সমান হলে প্রথমেই দেখা হতো গোল পার্থক্য। এরপর বিবেচনায় আসত মোট গোলসংখ্যা। ফলে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত বড় ব্যবধানে জয়ের সম্ভাবনা অনেক দলকে বাঁচিয়ে রাখত।
কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই প্রচলিত নিয়মে বড় পরিবর্তন এনেছে ফিফা। এখন পয়েন্ট সমান হলে প্রথমে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মুখোমুখি লড়াইয়ের ফলাফল বা হেড টু হেড রেকর্ড।
যদি হেড টু হেডেও দলগুলোকে আলাদা করা সম্ভব না হয়, তখন বিবেচনায় আসবে গ্রুপ পর্বের সামগ্রিক গোল পার্থক্য। এরপর দেখা হবে গ্রুপ পর্বে করা মোট গোলের সংখ্যা। তারপরও সমাধান না এলে কার্যকর হবে ফেয়ারপ্লে পয়েন্টের হিসাব।
ফেয়ারপ্লে পদ্ধতিতে হলুদ ও লাল কার্ডের জন্য দলগুলোর বিপক্ষে ঋণাত্মক পয়েন্ট যোগ করা হয়। সবচেয়ে কম শাস্তিমূলক পয়েন্ট পাওয়া দল সুবিধা পায়। এত কিছুর পরও যদি সমতা থেকে যায়, তাহলে সর্বশেষ ফিফা র্যাঙ্কিং বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এই নতুন নিয়মের প্রথম শিকার হয়েছে হাইতি। ব্রাজিলের কাছে হেরে যাওয়ার পর তাদের বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। যদিও এখনও তাদের একটি ম্যাচ বাকি রয়েছে, তবুও আর কোনো সমীকরণ তাদের পক্ষে কাজ করছে না।
হাইতি যদি নিজেদের শেষ ম্যাচে মরক্কোকে হারায় এবং ব্রাজিল স্কটল্যান্ডকে পরাজিত করে, তাহলে হাইতি ও স্কটল্যান্ডের পয়েন্ট সমান হবে। কিন্তু স্কটল্যান্ডের কাছে আগেই হেরে বসেছে হাইতি। ফলে মুখোমুখি লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকায় তারা আর এগোতে পারবে না।
একই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছে তুরস্কও। ‘ডি’ গ্রুপে প্যারাগুয়ের কাছে হারের পর তাদের বিদায় কার্যত নিশ্চিত হয়ে গেছে। শেষ ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রকে হারালেও তাদের সামনে এগোনোর পথ বন্ধ।
তুরস্ক যদি জয় পায় এবং অস্ট্রেলিয়া-প্যারাগুয়ে ম্যাচে কোনো একটি দল হারে, তাহলে কয়েকটি দলের পয়েন্ট তিনে পৌঁছাবে। কিন্তু তুরস্ক যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারাগুয়ে—দুই দলের কাছেই হেরেছে, তাই হেড টু হেড হিসাব তাদের বিপক্ষে যাচ্ছে।
একই পরিণতি হয়েছে ‘এফ’ গ্রুপের তিউনিসিয়ার। তারা শেষ ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে হারালেও নকআউটে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে না। কারণ তাদের ভাগ্যও নির্ধারিত হয়ে গেছে আগের ম্যাচের ফলাফলে।
সুইডেন নিজেদের ম্যাচে হারলেও তিউনিসিয়ার কোনো লাভ হবে না। দুই দলের পয়েন্ট সমান হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও মুখোমুখি লড়াইয়ে সুইডেন ৫-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল। ফলে তিউনিসিয়ার জন্যও আর কোনো পথ খোলা নেই।
ফিফার নতুন নিয়ম বিশ্বকাপকে নতুন মাত্রা দিয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে শেষ ম্যাচের আগে দলগুলোর ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে মুখোমুখি লড়াইয়ের গুরুত্বও আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।
তবে এই পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও কম হচ্ছে না। অনেকের মতে, এতে শেষ ম্যাচের ঐতিহ্যবাহী গোলের সমীকরণের রোমাঞ্চ কমে যাচ্ছে। আবার অনেকে মনে করছেন, মুখোমুখি লড়াইকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াটা প্রতিযোগিতাকে আরও ন্যায্য করে তুলেছে।
যাই হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার—২০২৬ বিশ্বকাপে শুধু জিতলেই হবে না, প্রতিটি ম্যাচের ফলই হয়ে উঠছে ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বড় হাতিয়ার। আর গ্রুপে চতুর্থ হওয়া মানেই তো শেষ পর্যন্ত বিদায়ের ঘণ্টা বাজা।
























