ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপের আনুষ্ঠানিকতা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে তাঁর মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হয়েছে, যেখানে দেশি-বিদেশি অতিথি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। কয়েক দিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনকে ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শোকানুষ্ঠান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার ভোরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তাঁর সঙ্গে নিহত অন্যান্য ব্যক্তির মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। এরপর প্রধান নামাজের হলে মরদেহগুলো রাখা হয়, যাতে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অতিথিরা শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারেন। সকাল থেকেই সেখানে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে।
গ্র্যান্ড মোসাল্লা ইরানের সবচেয়ে বড় জুমার নামাজ আদায়ের স্থানগুলোর একটি। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোও সাধারণত এখানেই অনুষ্ঠিত হয়। তাই খামেনির শেষবিদায়ের প্রথম পর্বের জন্য এই স্থানকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
শ্রদ্ধা নিবেদনকারীদের মধ্যে প্রথম দিকেই ছিলেন ইন্দোনেশিয়া ও আফগানিস্তানের ইসলামি আলেম, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন প্রতিনিধি। পাশাপাশি ইরানে স্বীকৃত ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শেষবিদায়ের এই আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিদল অংশ নেবে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বিশেষ দূত এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও পর্যায়ক্রমে তেহরানে পৌঁছাচ্ছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত আটজন সরকারপ্রধান এবং ১২টি দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার এই শোকানুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামাজিক সংগঠন, বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় নেতা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইরান সরকার এই আয়োজনকে আন্তর্জাতিক সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে তুলে ধরছে।
তবে ইরান জানিয়েছে, যেসব ইউরোপীয় দেশ সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিল, তাদের এই রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
সরকারিভাবে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি ব্যক্তিগত বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সাম্প্রতিক সংঘাতে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের কর্মকর্তা এবং তাঁদের স্বজনরা উপস্থিত হয়ে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের সব নাগরিককে শেষবিদায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, রাজনৈতিক মত, জাতিগত পরিচয় কিংবা ধর্মীয় বিভেদ ভুলে সবাই যেন ঐক্যবদ্ধভাবে এই জাতীয় শোকানুষ্ঠানে অংশ নেয়।
প্রেসিডেন্ট তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন, এই আয়োজন শুধু একজন নেতাকে বিদায় জানানোর অনুষ্ঠান নয়, বরং জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় সংহতির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হবে। তিনি জনগণকে শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
ইরানের কর্মকর্তাদের ধারণা, কয়েক দিনব্যাপী এই শোকানুষ্ঠানে এক কোটি ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে। যদি সেই পূর্বাভাস বাস্তব হয়, তবে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় শেষবিদায়ের অনুষ্ঠানে পরিণত হবে।
আগামী শনিবার ও রোববার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হবে। এই সময় লাখো মানুষ সেখানে এসে তাঁদের শ্রদ্ধা জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এরপর সোমবার তেহরানের বিভিন্ন সড়কজুড়ে একটি বৃহৎ শোকযাত্রার আয়োজন করা হবে। এতে সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক বাহিনীর সদস্য, ধর্মীয় নেতাসহ সাধারণ জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
শোকযাত্রা শেষে মরদেহ পবিত্র শহর কুমে নেওয়া হবে। সেখানে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিশেষ দোয়া ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। কুম ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হওয়ায় এই পর্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এরপর ইরাকের বাগদাদ, কারবালা এবং নাজাফ শহরেও স্মরণানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এসব শহর শিয়া মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র হওয়ায় সেখানে বিশেষ ধর্মীয় আয়োজন রাখা হয়েছে।
সবশেষে আগামী ৯ জুলাই মাশহাদে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দাফন করা হবে। সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছে ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির মৃত্যু শুধু ইরানের জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও কূটনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাই তাঁর শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বর্তমানে তেহরানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পুরো অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আয়োজিত এই শোকানুষ্ঠানের মাধ্যমে ইরান একদিকে প্রয়াত নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছে, অন্যদিকে জাতীয় ঐক্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বার্তাও তুলে ধরার চেষ্টা করছে। আগামী কয়েক দিনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই শেষবিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।




























