চীন বাংলাদেশের বহুল আলোচিত তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনায় সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই প্রকল্পে বেইজিংয়ের নতুন আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে ভারতের অবস্থান এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে চীন। তিনি বলেন, সমীক্ষা পরিচালনা, প্রকল্পের নকশা তৈরি, প্রকৌশল পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপেই চীন অংশ নিতে আগ্রহী।
তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীটির ভয়াবহ ভাঙন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকট উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনার দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও চীন তিস্তা প্রকল্পে সমীক্ষার কিছু কাজ শুরু করেছিল। তবে ভারতের আপত্তির কারণে প্রকল্পটি আর এগোয়নি। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে এটি কার্যত স্থবির অবস্থায় ছিল।
তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিও এখনো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পন্ন হয়নি। বহু বছর ধরে এ বিষয়ে আলোচনা চললেও কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। একসময় চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হলেও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এবং পানিবণ্টন চুক্তি একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি নদীর পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বিএনপি সরকার তিস্তা প্রকল্পকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও একাধিকবার প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ফলে নতুন করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের গতি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই চীন তিস্তা প্রকল্পে সহায়তা দিতে আগ্রহী হয়েছে। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নই তাদের মূল বিবেচনা এবং এর বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।
তিস্তা নদীর উৎপত্তি ভারতের সিকিম অঞ্চলের সোলামো লেক থেকে। এরপর নদীটি সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলে প্রবেশ করে এবং পরে কুড়িগ্রামের চিলমারীর কাছে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়। এই নদীর ওপর নির্ভর করে উত্তরাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর কৃষি ও জীবিকা পরিচালিত হয়।
কর্মকর্তাদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ, নদী খনন, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং নদীতীর সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হতে পারে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা এবং কুড়িগ্রাম জেলার কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। সেচ সুবিধা বাড়ার পাশাপাশি ফসল উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা গেলে হাজার হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে পুনরুদ্ধার হওয়া জমি কৃষি, শিল্প এবং আবাসন উন্নয়নে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
তিস্তার অনেক স্থানে নদীর প্রস্থ পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত হলেও কোথাও আবার দেড় থেকে দুই কিলোমিটার। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নদীর গভীরতা বাড়িয়ে এর প্রবাহকে আরও কার্যকর করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে নদীর দুই তীরে নতুন জমি পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে প্রকল্পটি শুধু পানি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক কূটনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী হওয়ায় ভারতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশকে একদিকে চীনের সহযোগিতা কাজে লাগাতে হবে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে দক্ষ কূটনৈতিক কৌশলই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এ ছাড়া বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের স্বার্থও এই প্রকল্পকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে এটি কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং আঞ্চলিক কৌশলগত গুরুত্বও বহন করছে।
সব দিক বিবেচনায় তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

























