তিস্তার পানি বিপদ সীমার উপরে প্রবাহিত হওয়ায় দেশের উত্তরাঞ্চলের চার জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। টানা ভারী বৃষ্টিপাত এবং ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ার কারণে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানির প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২.১৬ সেন্টিমিটার, যা বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি বৃদ্ধির ফলে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পানির অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের ৩২টি গেট খুলে দেওয়ার পর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এর ফলে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং চার জেলার অন্তত ৭ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনও দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার অন্তত ১৭টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। ফলে অনেক পরিবার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
এদিকে বন্যার কারণে কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিস্তা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে চাষ করা চিনাবাদাম, ধানের বীজতলা, মিষ্টিকুমড়া এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, কয়েকদিন ধরে জমিতে পানি জমে থাকায় ফসলের ক্ষতি শুরু হয়েছে। অনেক ক্ষেতেই গাছ হলুদ হয়ে যাচ্ছে এবং ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
কালীগঞ্জ এলাকার একজন বাদাম চাষি জানান, তিনি লিজ নেওয়া জমিতে চিনাবাদাম চাষ করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে বাদামে পচন ধরেছে এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন আরও অনেক কৃষক। তারা বলেন, রাতে পানি কমলেও দিনে আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ফসলের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, চলতি মৌসুমে আমন ধানের আবাদে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা অনেক বীজতলাও পানিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হতে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়বেন কৃষকরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
পানিবন্দি মানুষেরা অভিযোগ করেছেন, গত কয়েক দিন ধরে তারা দুর্ভোগের মধ্যে থাকলেও পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি। অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। চরাঞ্চলের বাসিন্দারা দ্রুত সরকারি সহায়তা ও ত্রাণ বিতরণের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
রংপুর বিভাগের প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতোমধ্যে পানিবন্দি পরিবারের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকা প্রস্তুত হওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, টানা বর্ষণ এবং উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে তিস্তার পানি আরও বাড়তে পারে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের হাজারো মানুষ বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।



























