ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসেছে। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকলেও পরবর্তীতে সৌদি যুবরাজ নিজের দেশের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নেন। এর জেরে দুই মিত্র দেশের নেতৃত্বের মধ্যে একাধিক উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা ও মতবিরোধ তৈরি হয়।
যুদ্ধের প্রথম দিকে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি সামরিক পরিকল্পনা নেয়। পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের সম্ভাব্য হামলা প্রতিহত করা।
কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই যুক্তরাষ্ট্র বড় ধাক্কা খায়। সৌদি আরব স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এ অভিযানের জন্য তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে এটি ছিল অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত, কারণ দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক সহযোগিতায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার।
জানা যায়, পেন্টাগন এ পরিকল্পনা নিয়ে আগে সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেনি। ফলে রিয়াদের আপত্তি প্রকাশের পর হোয়াইট হাউস ও সৌদি রাজপরিবারের মধ্যে টানা কয়েক দিন জরুরি ফোনালাপ চলে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেন। একই সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার এবং মার্কো রুবিওও সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তবে সৌদি যুবরাজ নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তাঁর আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিলে ইরান সরাসরি সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে। এই অবস্থানের ফলে ট্রাম্প প্রশাসন মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ কার্যত স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
ওয়াশিংটনের আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের গবেষক হুসেইন ইবিশের মতে, সৌদি আরব তখন ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনায় যুক্ত হলে ইরানের বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলার মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্কের নতুন বাস্তবতার সূচনা করে। একসময় যেখানে রিয়াদ প্রায় সব বড় নিরাপত্তা ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থান অনুসরণ করত, এখন সেখানে সৌদি আরব নিজস্ব কৌশল ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই সৌদি নেতৃত্ব বুঝতে শুরু করে যে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য তাদেরই দিতে হতে পারে। কারণ হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি রপ্তানি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—সব ক্ষেত্রেই সৌদি আরব সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেই সম্পর্ক যুদ্ধের সময় সৌদি নেতৃত্বকে নতুন কূটনৈতিক বিকল্পও দিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরশীলতার প্রয়োজন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
বর্তমানে সৌদি কর্মকর্তারা ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে হরমুজ প্রণালি, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে আলোচনা করছেন। রিয়াদের দৃষ্টিতে এসব বিষয় পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও বেশি তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি।
মার্কিন সূত্রের দাবি, যুদ্ধ শুরুর আগে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। পরে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও সৌদি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ দাবি অস্বীকার করেছে।
পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে যখন দেখা যায়, ধারাবাহিক হামলার পরও ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। তখন সৌদি নেতৃত্ব যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার বদলে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিতে শুরু করে।
এক পর্যায়ে সৌদি আরব সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত গোপন প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয় বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আবুধাবির তুলনায় রিয়াদ অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছিল।
অন্যদিকে কাতার ও ওমান পুরো সংঘাতজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। ফলে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর মধ্যেও যুদ্ধ মোকাবিলার কৌশলে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়।
সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তী সমঝোতার পর ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির চেষ্টা করছে। সৌদি আরবও চায় এমন একটি কাঠামো, যাতে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান কিংবা ইসরায়েলের মধ্যে নতুন সংঘাত শুরু হলেও উপসাগরীয় দেশগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন সৌদি নেতৃত্বের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে কোনো বড় সংঘাত হলে যুক্তরাষ্ট্র আদৌ তাদের পাশে দাঁড়াবে কি না, সে প্রশ্ন এখন রিয়াদে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।
এই অবিশ্বাসের শিকড় আরও পুরোনো। ২০১৯ সালে সৌদি তেল স্থাপনায় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরও ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি সামরিক জবাব দেয়নি। সেই ঘটনার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে সৌদি নেতৃত্বের সন্দেহ তৈরি হয়।
গবেষক হুসেইন ইবিশ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই বড় সংঘাত শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির দায় মিত্রদের ওপর ছেড়ে দেয়। তাঁর মতে, এ কারণেই বর্তমানে সৌদি আরব আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক ও স্বনির্ভর নীতি অনুসরণ করছে।
অবশ্য হোয়াইট হাউস এ ধরনের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নয়। মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি যুবরাজের সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত ভালো এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই ওয়াশিংটন সিদ্ধান্ত নেয়।
তবুও বাস্তবতা হলো, দুই দেশের সম্পর্ক এখন আগের মতো একমুখী নয়। নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং আঞ্চলিক রাজনীতির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সৌদি আরব নিজস্ব অবস্থান স্পষ্ট করছে।
একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সৌদি আরবে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার বিষয়ে দুই সরকার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এ পরিকল্পনা শিগগিরই মার্কিন কংগ্রেসে উপস্থাপন করা হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কিছু নীতিনির্ধারক আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি সৌদি আরবের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও রিয়াদ বারবার দাবি করেছে, তাদের লক্ষ্য কেবল বেসামরিক জ্বালানি উন্নয়ন।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির বিকল্প স্থলপথ তৈরির বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি পরিবহন আরও নিরাপদ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কও এখনো শক্তিশালী। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অস্ত্রের অন্যতম বড় ক্রেতা। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বিদ্যমান।
ট্রাম্পের দুই মেয়াদেই তাঁর প্রথম বড় বিদেশ সফর ছিল সৌদি আরব। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে জ্যারেড কুশনারের ব্যক্তিগত সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যেই যুবরাজকে নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন ট্রাম্প। একটি বিনিয়োগ সম্মেলনে তিনি মন্তব্য করেন, সৌদি যুবরাজ কখনো ভাবেননি যে শেষ পর্যন্ত তাঁকে ট্রাম্প প্রশাসনের সহযোগিতা এতটা প্রয়োজন হবে। এই মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অস্বস্তি তৈরি করে।
সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপসাগরীয় অঞ্চল সফর করলেও সৌদি আরব সফর এড়িয়ে যান। যদিও বাহরাইনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে তাঁর আলাদা বৈঠক হয়।
রুবিও বৈঠকে বলেন, সাম্প্রতিক সংকট দুই দেশের অংশীদারত্বকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল। তবে তাঁর দাবি, এই সম্পর্ক এখনো দৃঢ় রয়েছে এবং উভয় দেশ আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করবে।
যদিও যুদ্ধবিরতি আপাতত উত্তেজনা কমিয়েছে, তবু মূল সমস্যাগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন এবং নতুন পারমাণবিক চুক্তির ভবিষ্যৎ—সবই এখনো অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। সৌদি আরব এখন আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করতে চায় না। বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও চীন, পাকিস্তানসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজের সাম্প্রতিক মতবিরোধ শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকট নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।




























