মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ এবং হিজবুল্লাহকে মোকাবিলায় সিরিয়াকে ব্যবহার করার আলোচনার মধ্যেই ভিন্ন বার্তা দিয়েছে দামেস্ক। লেবাননে সফর করে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি স্পষ্ট করেছেন, সিরিয়ার নতুন প্রশাসনের লক্ষ্য সামরিক সংঘাত নয়; বরং সংলাপ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে জাতীয় স্বার্থে হিজবুল্লাহর সঙ্গেও আলোচনা করতে প্রস্তুত সিরিয়া।
স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের পতনের পর এটি আল-শাইবানির দ্বিতীয় লেবানন সফর। তবে এবারের সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, এবার তিনি শুধু লেবাননের রাষ্ট্রীয় নেতাদের সঙ্গেই নয়, পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। বেরি আমাল মুভমেন্টের প্রধান এবং হিজবুল্লাহর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত।
মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বৈঠক ছিল অত্যন্ত কৌশলগত। এর মাধ্যমে সিরিয়া একদিকে লেবানন সরকারকে আশ্বস্ত করেছে যে তারা মার্কিন চাপের মুখেও লেবাননে সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর কাছেও একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছে—সীমান্তে উত্তেজনা কমাতে সহযোগিতা করলে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো সম্ভব।
লেবাননের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, পুরো সফরটি দুই দেশের কর্তৃপক্ষের সমন্বয়েই আয়োজন করা হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য ছিল সিরিয়ার অবস্থান পরিষ্কার করা এবং সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটানো।
ওই কর্মকর্তা বলেন, লেবাননের মধ্যে একটি বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল যে ওয়াশিংটনের চাপে পড়ে সিরিয়া হয়তো সীমান্তে সামরিক অভিযান চালাতে পারে। শাইবানির সফর সেই শঙ্কা অনেকটাই দূর করেছে।
তিনি আরও জানান, প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সাম্প্রতিক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে দেওয়া বক্তব্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছিল। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি সফর সেই আশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে বৈঠক। আগের সফরে তাঁর সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়নি। এবার সেই পরিবর্তন থেকেই বোঝা যায়, সিরিয়া এখন হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে আরও বাস্তববাদী অবস্থান নিচ্ছে।
বাশার আল-আসাদের সময় থেকেই বেরি দামেস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। যদিও তিনি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হিজবুল্লাহর সামরিক ভূমিকার সমালোচনা করেছিলেন, তবুও লেবাননের শিয়া রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে তাঁর প্রভাব এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই বেরিকে দুই পক্ষের সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিরিয়া ও হিজবুল্লাহ—দুই পক্ষের কাছেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আল-শাইবানি বলেন, জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন হলে হিজবুল্লাহর সঙ্গে দেখা করতে সিরিয়া প্রস্তুত। তাঁর এই বক্তব্যকে দামেস্কের সবচেয়ে স্পষ্ট অবস্থান হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
এর আগে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা হলে হিজবুল্লাহসহ লেবাননের সব রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে প্রস্তুত সিরিয়া।
শুধু সিরিয়ার অবস্থানই নয়, হিজবুল্লাহর ভাষাতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। সংগঠনটির মহাসচিব নাইম কাসেম সম্প্রতি সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের একটি ‘নতুন অধ্যায়’ শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।
হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ নেতা নওয়াফ মুসাওয়িও প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে ‘ভাই আহমেদ আল-শারা’ বলে সম্বোধন করেছেন। একসময় যাঁকে তারা কট্টর প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখত, তাঁকে নিয়ে এমন ভাষা ব্যবহারকে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, এখন সরাসরি যোগাযোগ শুরু করতে আর দেরি করার কোনো কারণ নেই। উভয় পক্ষের সম্পর্ককে আরও সুসংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক যোগাযোগ স্থাপনে তুরস্ক মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ, বর্তমান সিরীয় প্রশাসনের সঙ্গে আঙ্কারার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
এদিকে পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য। তিনি কয়েক দফায় বলেছেন, হিজবুল্লাহকে মোকাবিলার দায়িত্ব সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে।
গত জুনে এনবিসির একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সিরিয়াকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারে কিংবা দায়িত্বও দিতে পারে। তাঁর দাবি ছিল, সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব এই দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হতে পারে।
তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেননি, সিরিয়ার ভূমিকা কেমন হবে। সেটি সামরিক অভিযান, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নাকি কূটনৈতিক চাপ—তা তিনি ব্যাখ্যা করেননি।
পরে জি-৭ সম্মেলনের সময় ট্রাম্প আরও সরাসরি বলেন, তিনি ইসরায়েলকে পরামর্শ দিয়েছেন, হিজবুল্লাহকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব সিরিয়ার ওপর ছেড়ে দিতে।
একই সঙ্গে তিনি লেবাননে ইসরায়েলের দীর্ঘ সামরিক অভিযানের সমালোচনাও করেন। তাঁর মতে, এই অভিযানে অনেক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
পরদিন ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, হিজবুল্লাহ প্রসঙ্গে তিনি প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করেছেন। তবে সিরিয়া কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেননি।
ট্রাম্পের এসব বক্তব্যের পর লেবাননে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়। অনেকেই আশঙ্কা করেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সিরিয়াকে সংঘাতে টেনে আনতে চাইছে।
এই পরিস্থিতিতেই শাইবানি ও বেরির মধ্যে প্রায় ৪৫ মিনিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক সম্পর্কে অবগত সূত্রের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, সেখানে মার্কিন চাপ এবং সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সূত্রের দাবি, শাইবানি বেরিকে জানিয়েছেন, উত্তর-পূর্ব সীমান্তে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে ওয়াশিংটনের চাপ বাড়ছে। তবে সিরিয়া এমন সংঘাতে জড়াতে চায় না।
একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় হিজবুল্লাহর কিছু অবস্থান এখনো উত্তেজনার কারণ হয়ে রয়েছে। এসব ঘাঁটি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে।
শাইবানি প্রস্তাব দেন, সীমান্তের এসব অবস্থানের নিয়ন্ত্রণ যদি লেবাননের সেনাবাহিনীর হাতে দেওয়া হয়, তাহলে উত্তেজনা অনেকটাই কমে যাবে এবং সামরিক অভিযানের পক্ষে যারা যুক্তি দিচ্ছে, তাদের অবস্থান দুর্বল হবে।
বৈঠকে তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তাঁর ভাষায়, সিরিয়া সুন্নি-শিয়া বিভাজন আরও গভীর করতে চায় না। কারণ, নতুন করে কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাত পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
তিনি স্পিকার বেরিকে বলেন, ‘আপনারা হারলে আমরাও হারব। এ অঞ্চল আর রক্তপাত সহ্য করতে পারবে না।’
এর আগে আল মাশহাদ টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও প্রেসিডেন্ট আল-শারা বলেছিলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় লেবাননে আগ্রাসনের বিষয় নয়, বরং সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, সিরিয়ার লক্ষ্য লেবাননের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো। সামরিক সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানই তাদের অগ্রাধিকার।
শারা আরও বলেন, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় হিজবুল্লাহ যে ভূমিকা রেখেছিল, তা সিরীয়দের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। তারপরও ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার স্বার্থে সংলাপের পথ খোলা রাখা প্রয়োজন।
শাইবানির সাম্প্রতিক সফর সেই নীতিকেই আরও স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে তিনি হিজবুল্লাহ ও লেবানন সরকারকে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে সীমান্তে উত্তেজনা কমে এবং সিরিয়া আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় শক্ত অবস্থান নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখনো সিরিয়া ও হিজবুল্লাহর মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। তবে দুই পক্ষই আগের বৈরিতার অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে সীমিত সংলাপের পথে এগোচ্ছে।
দামেস্ক মনে করছে, জোরপূর্বক কোনো সামরিক অভিযানে জড়ানো হলে তা শুধু লেবানন নয়, পুরো সিরিয়াকেই নতুন অস্থিরতার মুখে ঠেলে দেবে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহও বুঝতে পারছে, আঞ্চলিক চাপের এই সময়ে সিরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা তাদের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, লেবাননে সিরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত। ট্রাম্পের চাপ, ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটের মধ্যেও দামেস্ক আপাতত সংঘাতের বদলে সংলাপকেই সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে তুলে ধরছে।



























