বিদেশে চিকিৎসা খরচ মেটাতে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডলার পাঠানোর সীমা বাড়ানো এবং প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় এখন অনেক রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক পথের পরিবর্তে ব্যাংকের মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চার বছরের ব্যবধানে বৈধ পথে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো অর্থ প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে।
একসময় বিদেশে চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ পাঠাতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হতো। সাধারণ রোগীদের জন্য এই প্রক্রিয়া অনেক সময় জটিল হয়ে উঠত। ফলে অনেকে অনুমোদনের ঝামেলা এড়িয়ে হুন্ডি বা অন্য অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে বিদেশে অর্থ নিয়ে চিকিৎসার খরচ মেটাতেন।
তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন এসেছে ডলার পাঠানোর সীমা বাড়ানোর পর। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য অনুমোদন ছাড়াই ব্যাংকের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়ের সুযোগ দেয়। এর ফলে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকা রোগীদের বিদেশে চিকিৎসার খরচ পরিশোধ করা অনেক সহজ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বৈধ পথে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছিল মাত্র ৩৪ লাখ ডলার। পরের অর্থবছরে তা কিছুটা কমে যায়। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ডলারে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈধ পথে চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য পাঠানো অর্থের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে বৈধ পথে অর্থ পাঠানো বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বৃদ্ধি মূলত বৈধ ব্যবস্থার সুযোগ বাড়ানোর ফল। আগে অনেক রোগীকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হলে নগদ অর্থ বহন করতে হতো অথবা অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর ঝুঁকি নিতে হতো। এখন হাসপাতালের নামে অর্থ পরিশোধ কিংবা আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকায় রোগীরা তুলনামূলক নিরাপদ উপায়ে চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারছেন।
বিদেশে চিকিৎসার গন্তব্যেও পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা জটিলতা, চিকিৎসার মান এবং অন্যান্য কারণে অনেক বাংলাদেশি রোগী ভারতের পাশাপাশি থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন। এসব দেশে চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় রোগীদের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনও বেড়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, চিকিৎসার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর নিয়ম আরও সহজ করা গেলে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শপত্র বিবেচনায় নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়া হলে হুন্ডির ব্যবহার কমতে পারে।
তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বর্তমানে বৈধ পথে পাঠানো অর্থ বিদেশে বাংলাদেশিদের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের খুবই ছোট অংশ। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশিরা প্রতিবছর বিদেশে চিকিৎসার জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন। এর বড় অংশ এখনো পর্যটন ভিসা বা অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে পরিশোধ করা হয়।
বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের এই প্রবণতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও প্রভাব ফেলে। একদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া রোগীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সঠিক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে বিদেশে চিকিৎসা খরচ মেটাতে বৈধ পথে ডলার পাঠানোর সুযোগ বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। এতে রোগীরা যেমন নিরাপদ ও স্বচ্ছ উপায়ে অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন, তেমনি দেশের বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থায়ও আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের ব্যবহার বাড়ছে। তবে প্রকৃত চিত্র জানতে হলে বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের পুরো প্রবাহকে বৈধ ব্যবস্থার আওতায় আনা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।


























