রিফাত রশিদের স্মৃতিচারণ ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের নানা অজানা দিক। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সভাপতি হিসেবে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে আন্দোলনের প্রস্তুতি, নেতৃত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের শুরুতে মূল লক্ষ্য ছিল কোটা সংস্কার ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করা। তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি পাল্টে যায় এবং আন্দোলনের চরিত্রও পরিবর্তিত হয়।
রিফাত রশিদ জানান, কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ শুরু হয়। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ফেসবুক গ্রুপ এবং মেসেঞ্জার ব্যবহার করে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়, যাতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে পারেন। তাঁর দাবি, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই নেটওয়ার্ক আন্দোলনকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আন্দোলনকে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর করতে বিভিন্ন দায়িত্ব আলাদা করে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। কেউ অনলাইন সমন্বয়, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক যোগাযোগ, কেউ জেলা পর্যায়ের সংগঠন এবং কেউ লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন। এতে আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।
স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে ১৬ জুলাইয়ের ঘটনাও। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় বিভিন্ন সহিংস ঘটনার পর আন্দোলনের লক্ষ্য নতুন মাত্রা পায়। আন্দোলনের অভ্যন্তরে ভবিষ্যৎ কর্মসূচি, দাবিনামা এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়। তিনি দাবি করেন, সে সময় ১১ দফা দাবির একটি প্রাথমিক খসড়া তৈরি করা হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তিত হয়ে নতুন আকার নেয়।
রিফাত রশিদ বলেন, আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং গ্রেপ্তার আতঙ্কের কারণে সমন্বয়কদের বারবার অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছিল। অনেক সময় ফোন ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি স্মরণ করেন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তাঁর স্বজনেরা চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান, যারা সেই সংকটময় সময়ে আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন।
তাঁর বক্তব্যে আরও উঠে আসে হাসপাতাল পরিদর্শন, আহতদের খোঁজ নেওয়া এবং মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি। তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিক মহলেও আন্দোলনের পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে একাধিকবার আশ্রয় পরিবর্তন করতে হয় এবং বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়।
রিফাত রশিদের মতে, আন্দোলনের একটি বড় শক্তি ছিল বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। তিনি বলেন, বিভিন্ন মতাদর্শের সংগঠন নিজেদের মতামত দিলেও কর্মসূচি নির্ধারণে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। এ কারণে আন্দোলনের বিস্তৃতি আরও বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের সমর্থনও বৃদ্ধি পায়।
তিনি বিশেষভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, অনলাইন প্রচারণা, প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন, গ্রাফিতি, দেয়াললেখা এবং সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আন্দোলনের বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এসব উদ্যোগ আন্দোলনের জনসমর্থন বাড়াতে সহায়ক হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
স্মৃতিচারণে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে দাবি পরিবর্তন, নেতৃত্বের মধ্যে মতবিনিময় এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের পরিস্থিতি প্রতিদিন বদলাচ্ছিল, ফলে বাস্তবতার আলোকে কর্মসূচি ও দাবিও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি বলেন, আন্দোলনের ভেতরে মতপার্থক্য থাকলেও মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবাই একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করেছেন।
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ প্রসঙ্গে রিফাত রশিদ বলেন, সেই দিনটি তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দীর্ঘ আন্দোলনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা তিনি স্মরণ করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমন্বয়ক, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে নতুনভাবে দায়িত্ব বণ্টনের কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।
তবে তাঁর মতে, আন্দোলনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এর প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করা। তিনি মনে করেন, সময়ের সঙ্গে অনেক অবদান আড়ালে চলে গেছে, আবার নতুন অনেক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। আহত ব্যক্তি, নিহতদের পরিবার এবং আন্দোলনের নেপথ্যের অনেক মানুষের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।
সবশেষে রিফাত রশিদ আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নতুন প্রজন্ম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবে। তাঁর মতে, জুলাই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


























