ঢাকা ১১:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo সব দল বলতে কি আওয়ামী লীগকেও বোঝানো হয়েছে? প্রশ্ন তুললেন সারজিস আলম Logo প্রিপেইড মিটার চার্জ বাতিল ২০২৬: গ্রাহকদের বড় স্বস্তির ঘোষণা Logo আমির খানের বিয়ে: গৌরীর সঙ্গে নতুন অধ্যায়ের প্রস্তুতি Logo তাপপ্রবাহ পূর্বাভাস: জুনজুড়ে গরম ও কম বৃষ্টির বিশেষ চিত্র Logo ওয়ালটন চাকরি ২০২৬: সিনিয়র এক্সিকিউটিভ পদে আবেদন অনলাইনে Logo লাইভ শপিং চাকরি সার্কুলার: আকর্ষণীয় বেতনে নিয়োগের সুযোগ Logo সাগর-রুনি হত্যা তদন্তে নতুন জটিলতা, খুঁজে মিলছে না কর্মকর্তাদের Logo হাম মৃত্যু ছাড়াল ৬০০, নতুন আক্রান্ত আরও ৫৫ Logo আর্জেন্টিনা নয়, ব্রাজিলও নয়; সবচেয়ে দামি দল ফ্রান্স Logo সুন্দরবন ভ্রমণ প্যাকেজ: খরচ, দর্শনীয় স্থান ও পূর্ণ গাইড

জুলাই অভ্যুত্থান পথভ্রষ্ট? শাবিপ্রবি সেমিনারে বিশ্লেষণ

জুলাই অভ্যুত্থান পথভ্রষ্ট? শাবিপ্রবি সেমিনারে বিশ্লেষণ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ নেতৃত্বের ভূমিকা, লক্ষ্য নির্ধারণের অভাব এবং তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের প্রভাব—এসব বিষয়কে সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, লক্ষ্যহীনতা ও বাহ্যিক প্রভাবের কারণে এই অভ্যুত্থান তার মূল পথ থেকে সরে গেছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে শাবিপ্রবির পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে ‘দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জির নির্বাচনী রাজনীতি: নেপাল ও বাংলাদেশে তরুণদের ভিন্নধর্মী ফলাফল’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। বিভাগের ইলেকশন ল্যাবের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করলেও, পরবর্তী সময়ে তা নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মত দেন তারা। এর ফলে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং ফলাফল উভয়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা বলেন, নেপালের জেন-জি আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার একটি বড় পার্থক্য হলো লক্ষ্য স্থিরতার বিষয়টি। নেপালের তরুণরা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সামনে রেখে এগিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ধরনের স্পষ্ট লক্ষ্য দেখা যায়নি। তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর ছাত্রনেতাদের ভূমিকা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।

তিনি বাংলাদেশের জনগণকে ‘দ্বিধাগ্রস্ত গণতন্ত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখানে নেপালের মতো ফলাফল অর্জন সম্ভব হয়নি। তার মতে, এসব কারণ মিলিয়েই তরুণ নেতৃত্বের সাফল্য সীমিত হয়ে গেছে।

সেমিনারে পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেকেই রাজনৈতিক অভিপ্রায় নিয়ে কাজ করেছেন, যা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তোলে।

তিনি আরও বলেন, জেন-জি আন্দোলন থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক দল এনসিপির কৌশল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের সংগঠন কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি আন্দোলনের অর্জনকে দুর্বল করেছে বলে মনে করেন তিনি।

ইলেকশন ল্যাবের পরিচালক অধ্যাপক মো. সাহাবুল হক বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের প্রভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। তার ভাষায়, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দেন কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণ করেন। এতে আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং জনগণের আস্থা কমে যায়।

তিনি নেপালের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে তরুণরা তাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। ফলে তারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় যেতে পেরেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি বলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সৈয়দ আশরাফুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন ইলেকশন ল্যাবের উপপরিচালক অধ্যাপক জায়েদা শারমিন। এছাড়া বক্তব্য দেন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. এমদাদুল হক।

সেমিনারে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, এই ধরনের আলোচনা তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক। তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের গবেষণাধর্মী আলোচনা আরও বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে তরুণ প্রজন্ম বাস্তবভিত্তিক রাজনৈতিক ধারণা গড়ে তুলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তরুণ নেতৃত্ব কতটা সুসংগঠিত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং বাস্তবমুখী হতে পারে তার ওপর। একই সঙ্গে বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কতটা স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে থাকছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সব দল বলতে কি আওয়ামী লীগকেও বোঝানো হয়েছে? প্রশ্ন তুললেন সারজিস আলম

জুলাই অভ্যুত্থান পথভ্রষ্ট? শাবিপ্রবি সেমিনারে বিশ্লেষণ

Update Time : ১০:০৯:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ নেতৃত্বের ভূমিকা, লক্ষ্য নির্ধারণের অভাব এবং তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের প্রভাব—এসব বিষয়কে সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, লক্ষ্যহীনতা ও বাহ্যিক প্রভাবের কারণে এই অভ্যুত্থান তার মূল পথ থেকে সরে গেছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে শাবিপ্রবির পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে ‘দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জির নির্বাচনী রাজনীতি: নেপাল ও বাংলাদেশে তরুণদের ভিন্নধর্মী ফলাফল’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। বিভাগের ইলেকশন ল্যাবের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করলেও, পরবর্তী সময়ে তা নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মত দেন তারা। এর ফলে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং ফলাফল উভয়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন  এনসিপি চট্টগ্রাম সমাবেশে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা বলেন, নেপালের জেন-জি আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার একটি বড় পার্থক্য হলো লক্ষ্য স্থিরতার বিষয়টি। নেপালের তরুণরা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সামনে রেখে এগিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই ধরনের স্পষ্ট লক্ষ্য দেখা যায়নি। তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর ছাত্রনেতাদের ভূমিকা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।

তিনি বাংলাদেশের জনগণকে ‘দ্বিধাগ্রস্ত গণতন্ত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখানে নেপালের মতো ফলাফল অর্জন সম্ভব হয়নি। তার মতে, এসব কারণ মিলিয়েই তরুণ নেতৃত্বের সাফল্য সীমিত হয়ে গেছে।

সেমিনারে পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেকেই রাজনৈতিক অভিপ্রায় নিয়ে কাজ করেছেন, যা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তোলে।

আরও পড়ুন  জ্যৈষ্ঠে রাজধানীর বাজারে মৌসুমি ফলে ভরপুর রঙিন পসরা

তিনি আরও বলেন, জেন-জি আন্দোলন থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক দল এনসিপির কৌশল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের সংগঠন কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি আন্দোলনের অর্জনকে দুর্বল করেছে বলে মনে করেন তিনি।

ইলেকশন ল্যাবের পরিচালক অধ্যাপক মো. সাহাবুল হক বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের প্রভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। তার ভাষায়, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দেন কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণ করেন। এতে আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং জনগণের আস্থা কমে যায়।

তিনি নেপালের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে তরুণরা তাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। ফলে তারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় যেতে পেরেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি বলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন  লোডশেডিং কমবে: আগামী সপ্তাহ থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সৈয়দ আশরাফুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন ইলেকশন ল্যাবের উপপরিচালক অধ্যাপক জায়েদা শারমিন। এছাড়া বক্তব্য দেন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. এমদাদুল হক।

সেমিনারে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, এই ধরনের আলোচনা তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক। তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের গবেষণাধর্মী আলোচনা আরও বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে তরুণ প্রজন্ম বাস্তবভিত্তিক রাজনৈতিক ধারণা গড়ে তুলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তরুণ নেতৃত্ব কতটা সুসংগঠিত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং বাস্তবমুখী হতে পারে তার ওপর। একই সঙ্গে বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কতটা স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে থাকছে।