দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে ভুক্তভোগীদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম ছুটির দিনেও চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিচার ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সোমবার বিকেলে চুয়াডাঙ্গা সার্কিট হাউসে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় বিচার বিলম্ব কমাতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার মতে, বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি এবং মামলার জট কমানো এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ঈদের ছুটি শেষে প্রথম কার্যদিবসেই মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হবে। সরকার এই মামলাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তিনি জানান, ঘটনার পর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আসামির জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এক সপ্তাহের মধ্যেই তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে, যা দেশের বিচার ব্যবস্থায় দ্রুততম পদক্ষেপগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতির সুযোগ নেই। এসব ঘটনায় অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন হলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং অপরাধপ্রবণতাও কমবে। সাম্প্রতিক সময়ে ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায়ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সহিংসতা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মন্ত্রী বলেন, সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকলেও হামলা বা সংঘর্ষ কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও নেতিবাচক বার্তা বহন করে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অঙ্গনে পারস্পরিক সহনশীলতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। পরে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন আইনমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম শুধু একজন কবি নন, তিনি বাঙালির সাহস, প্রতিবাদ ও মানবিক চেতনার প্রতীক। তার সাহিত্য ও দর্শন যুগে যুগে মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অনুপ্রাণিত করেছে। মন্ত্রী আরও বলেন, নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারা, মানবতার বার্তা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। নতুন প্রজন্মকে নজরুলের সাহিত্য ও আদর্শ সম্পর্কে আরও বেশি জানার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
কার্পাসডাঙ্গা মিশনারি মাঠে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। অনুষ্ঠানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। আইনমন্ত্রী বলেছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ছুটির দিনেও আদালতের কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত তদন্ত, সময়মতো অভিযোগপত্র দাখিল এবং ধারাবাহিক বিচার কার্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে ভুক্তভোগীরা দ্রুত ন্যায়বিচার পাবেন। একই সঙ্গে অপরাধীদের জন্যও এটি একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার জট কমবে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





























