বিএনপির সংস্কার নিয়ে সংঘাত এড়ানো উচিত বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ বিশ্লেষক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। সংগঠনটি মনে করে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর সময়টিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং নিরাপত্তা খাতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়িয়ে ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।
‘বাংলাদেশের নতুন সরকার কাজে নেমে পড়েছে’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর দেশের জন্য বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন। নতুন সরকার স্পষ্ট জনসমর্থন নিয়ে দায়িত্বে এলেও সেই সমর্থন দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় রূপান্তর করা সহজ হবে না। জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি হওয়ায় এখন ফলাফল দেখানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপির সংস্কার নিয়ে সংঘাত এড়ানো উচিত উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারকে একই সঙ্গে কয়েকটি বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা, রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ প্রশ্ন মোকাবিলা করতে হবে।
এসব বিষয়ে দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত না নিলে জনপ্রত্যাশা হতাশায় পরিণত হতে পারে। ক্রাইসিস গ্রুপ মনে করে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এখন সরকারের প্রথম সারির অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈদেশিক চাপের মতো বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান চায়। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে অসন্তোষ বাড়তে পারে। অর্থনৈতিক সাফল্যই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক সংস্কার আগামী মাসগুলোতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিএনপি জুলাই সনদের অনেক প্রস্তাব সমর্থন করলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছে।
ফলে সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় সমঝোতার পথেই এগোনো উচিত বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি।বিএনপির সংস্কার নিয়ে সংঘাত এড়ানো উচিত—এই বক্তব্যের অংশ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়, দলটি তাদের সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে একতরফা সিদ্ধান্ত নিলে বিরোধ বাড়তে পারে। সংবিধান সংশোধন বা কাঠামোগত পরিবর্তনের মতো বড় বিষয়ে সর্বদলীয় আলোচনার পরিবেশ জরুরি। নাহলে জনগণের একটি অংশ নিজেকে বঞ্চিত মনে করতে পারে। এতে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
ক্রাইসিস গ্রুপ আরও বলেছে, সরকার যদি অর্থবহ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে বলে মনে হয়, তাহলে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মতো দলগুলো সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরব হতে পারে। তাদের সমর্থকেরা রাজপথেও নামতে পারেন। দীর্ঘস্থায়ী সংস্কার বিরোধ সরকারকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে পারে। প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, নতুন সরকারের সামনে অন্যতম জটিল প্রশ্ন হলো দলটির রাজনৈতিক অবস্থান কী হবে। সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলীয় কার্যক্রম সীমিত রয়েছে। বিচার শেষ হলে নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত সরকারকে নিতে হবে।
বিএনপির সংস্কার নিয়ে সংঘাত এড়ানো উচিত বলার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোও পর্যালোচনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের উচিত পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া দায়ের হওয়া মামলাগুলো প্রত্যাহার করা। যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের পূর্ব রেকর্ড নেই এবং যারা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি নন, তাদের জামিন বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়বে বলে মত দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। বৈধ বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য মামলা ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ক্রাইসিস গ্রুপ মনে করে, শেখ হাসিনা-পরবর্তী সময়ে জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়েছে। মানুষ বিশ্বাস করে, প্রয়োজন হলে তারা আবারও রাজপথে নামতে পারে। তাই বর্তমান সরকারকে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে নতুন অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর চাপ পড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সরকারকে বৈশ্বিক ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিএনপির সংস্কার নিয়ে সংঘাত এড়ানো উচিত—এই বার্তায় মূলত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন জয়ের অর্থ সব প্রশ্নে একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নয়, বরং বৃহত্তর ঐকমত্য তৈরির দায়িত্বও। জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনা। জনগণ দ্রুত পরিবর্তন চায়, কিন্তু বাস্তবায়নে সময় লাগে। তাই স্বচ্ছতা, নিয়মিত অগ্রগতি তুলে ধরা এবং বিরোধীদের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া জরুরি। এতে আস্থা বাড়বে এবং অস্থিরতা কমবে।
সব মিলিয়ে বিএনপির সংস্কার নিয়ে সংঘাত এড়ানো উচিত বলে ক্রাইসিস গ্রুপ যে পরামর্শ দিয়েছে, তা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতি, সুশাসন, বিচার এবং রাজনৈতিক সমঝোতার সমন্বিত পথেই স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।






















