উজানের ঢলে দুধকুমার নদের পানি বিপৎসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচে, কুড়িগ্রামে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত।
দুধকুমার নদের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িগ্রামে নতুন করে বন্যার শঙ্কা তৈরি করেছে। টানা বৃষ্টি এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে জেলার দুধকুমার নদে পানি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। ইতোমধ্যে নদীটির পানি বিপৎসীমার মাত্র ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদী তীরবর্তী বেশ কয়েকটি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
রবিবার (২৮ জুন) রাত ৯টায় কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমার নদের পানির উচ্চতা ২৯ দশমিক ৫৮ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। অথচ এই পয়েন্টে বিপৎসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৯ দশমিক ৬০ মিটার। অর্থাৎ নদীটি বিপৎসীমার মাত্র ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, একই দিন সকাল ৬টায় পাটেশ্বরী পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ২৮ দশমিক ৮৯ মিটার। মাত্র ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে পানির উচ্চতা প্রায় ৬৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে রাত ৯টায় ২৯ দশমিক ৫৮ মিটারে পৌঁছে যায়। পানি বৃদ্ধির এই গতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও উদ্বেগে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে উজানের ঢল ও স্থানীয় বৃষ্টিপাত একসঙ্গে হলে নদীর পানি দ্রুত বাড়ে। বর্তমানে সেই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে কুড়িগ্রামে।
কুড়িগ্রাম আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই বৃষ্টির পানি স্থানীয় নদ-নদীতে প্রবাহিত হওয়ার পাশাপাশি ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিন উত্তরাঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দুধকুমার নদে পানি বাড়তে শুরু করায় নদী তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলোতে ইতোমধ্যে পানি প্রবেশ করেছে। কয়েকটি চরাঞ্চল, কৃষিজমি এবং গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে চলে গেছে। অনেক এলাকায় বাড়ির উঠান তলিয়ে গেছে এবং বসতবাড়িতে পানি প্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক দিনের তুলনায় রবিবার পানি অনেক দ্রুত বেড়েছে। পানি বাড়তে থাকলে গবাদিপশু, খাদ্যশস্য এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
দুধকুমার নদ সংলগ্ন এলাকার কৃষকরা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন। আমন ধানের বীজতলা, বিভিন্ন ধরনের সবজি ক্ষেত এবং মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পানি স্থায়ী হলে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই পানি কমে গেলে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তবে পানি যদি বিপৎসীমা অতিক্রম করে দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়, তাহলে কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে।
শুধু দুধকুমার নয়, জেলার ধরলা নদীর পানিও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় শহরের কুড়িগ্রাম পয়েন্টে ধরলা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ২৪ দশমিক ৭৭ মিটার।
যদিও নদীটি এখনও বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তবুও পানি বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীর পানিও কয়েকটি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টে ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় এসব নদীর পানিও আরও বাড়তে পারে।
সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বন্যাপ্রবণ ইউনিয়নগুলোতে জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
প্রয়োজন হলে আশ্রয়কেন্দ্র চালু, শুকনো খাবার বিতরণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। এছাড়া নদী তীরবর্তী মানুষকে নিয়মিত পরিস্থিতির খোঁজ রাখতে এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে দুধকুমার, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় এসব এলাকার মানুষকে বন্যার সঙ্গে লড়াই করতে হয়।
অনেক পরিবার ইতোমধ্যে গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। কেউ কেউ শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত করছেন, যাতে পরিস্থিতি খারাপ হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে পারেন।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার সব নদীর পানির উচ্চতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রতি কয়েক ঘণ্টা পরপর নতুন তথ্য সংগ্রহ করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানান, দুধকুমার নদের পানি যদি বিপৎসীমা অতিক্রম করে, তাহলে নিম্নাঞ্চলে আরও বিস্তৃত এলাকায় পানি প্রবেশ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি দ্রুত বাড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সময়মতো সতর্কতা, আগাম প্রস্তুতি এবং সঠিক তথ্য মানুষের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে।
তারা নদী তীরবর্তী মানুষকে গুজবে কান না দিয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ, শিশু ও বয়স্কদের নিরাপদ স্থানে রাখা এবং প্রয়োজনে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কুড়িগ্রামের দুধকুমার নদ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় উজানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং ঢলের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে নদীটি বিপৎসীমা অতিক্রম করবে কি না। তাই জেলার নদী তীরবর্তী মানুষের নজর এখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও প্রশাসনের নির্দেশনার দিকে।



























