বিশ্বকাপের আগে ফুটবলের আইন ও রেফারিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে ফিফা। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি খেলোয়াড়দের আচরণ, দ্বিতীয় হলুদ কার্ড এবং ম্যাচ চলাকালে ট্যাকটিক্যাল টাইমআউটের মতো বিষয়েও নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে এসব নিয়ম কার্যকর হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ফুটবল শুধু খেলোয়াড়দের দক্ষতা বা কৌশলের খেলা নয়, অনেক সময় রেফারির একটি সিদ্ধান্তও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিএআর প্রযুক্তি চালুর মাধ্যমে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কমানোর চেষ্টা করা হলেও এখনো অনেক ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে। সেই বাস্তবতা থেকেই বিশ্বকাপের আগে নতুন কিছু পরিবর্তনের পথে হাঁটছে ফিফা।
ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি) সম্প্রতি এক সভায় এসব পরিবর্তন অনুমোদন করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, খেলাকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং বিতর্কমুক্ত করার লক্ষ্যেই নতুন নিয়মগুলো চালু করা হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে ভিএআরের কার্যক্রমে। আগে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারলেও এখন থেকে কর্নার কিক বা ফ্রি-কিকের ঠিক আগে হওয়া ফাউল বা অন্য কোনো অপরাধের ঘটনাও পর্যালোচনা করা যাবে। যদি সেই ঘটনার সরাসরি প্রভাবে গোল বা পেনাল্টি হয়, তাহলে ভিএআর বিষয়টি রিভিউ করতে পারবে।
আইএফএবির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আক্রমণকারী দলের কোনো খেলোয়াড় কর্নার বা ফ্রি-কিক নেওয়ার আগে প্রতিপক্ষকে ফাউল করলে এবং পরে সেই সেট-পিস থেকে গোল হয়ে যায়, তাহলে বিষয়টি আর উপেক্ষিত থাকবে না। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ভিএআর রেফারিকে ঘটনাটি পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিতে পারবে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভিএআর প্রধান রেফারিকে অন-ফিল্ড রিভিউয়ের আহ্বান জানাবে। অর্থাৎ রেফারি মাঠের পাশে থাকা মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি নিজে পর্যবেক্ষণ করবেন। ভিডিও দেখে যদি নিশ্চিত হন যে বল সচল হওয়ার আগেই কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, তাহলে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
রেফারি চাইলে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়কে হলুদ বা লাল কার্ডও দেখাতে পারবেন। একই সঙ্গে ওই গোল বা পেনাল্টির সিদ্ধান্ত বাতিল করা হবে। এরপর যে কর্নার কিক বা ফ্রি-কিক থেকে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি পুনরায় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে।
ফিফা রেফারিজ কমিটির চেয়ারম্যান পিয়েরলুইজি কলিনা এই নিয়মের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তিনি মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত ইংল্যান্ড ও উরুগুয়ের একটি ম্যাচের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন, যেখানে কর্নার কিকের আগে সংঘটিত একটি ঘটনায় গোল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
কলিনার মতে, সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার বেন হোয়াইটের করা গোলটি বৈধ হওয়া উচিত ছিল না। কারণ কর্নার নেওয়ার ঠিক আগে ইংল্যান্ডের অ্যাডাম হোয়ার্টন উরুগুয়ের ডিফেন্ডার হোসে মারিয়া গিমেজকে স্পষ্টভাবে বাধা দিয়েছিলেন। নতুন নিয়ম থাকলে সেই গোল বাতিল হওয়ার সুযোগ ছিল।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে হলুদ কার্ড সংক্রান্ত বিষয়ে। এতদিন ভিএআর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড থেকে পাওয়া লাল কার্ডের সিদ্ধান্তে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারত না। তবে এখন সীমিত পরিসরে এই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে ভুল খেলোয়াড়কে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখানোর ঘটনা ঘটলে তা পর্যালোচনা করা যাবে। অনেক সময় দ্রুতগতির খেলায় রেফারি ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দিয়ে ফেলেন। নতুন নিয়মে এমন ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি হবে।
ফিফা মনে করছে, এতে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে কোনো দল অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কমবে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে এমন ভুলের প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।
শুধু কার্ড নয়, গোল কিক এবং কর্নার কিকের সিদ্ধান্ত নিয়েও ভিএআর নজর রাখবে। যদি কোনো পরিস্থিতিতে গোল কিক হওয়ার কথা থাকলেও ভুলবশত কর্নার কিক দেওয়া হয়, তাহলে সেটিও পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়েও নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। মাঠে দাঁড়িয়ে হাত, বাহু কিংবা জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে গোপনে কথা বলার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফিফা। অনেক সময় খেলোয়াড়েরা এমনভাবে যোগাযোগ করেন যাতে প্রতিপক্ষ বা রেফারি কিছু বুঝতে না পারেন।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যদি কোনো খেলোয়াড়ের এমন আচরণকে সন্দেহজনক বা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে রেফারি কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারবেন। প্রয়োজন হলে লাল কার্ডও দেখানো হতে পারে।
তবে ফিফা স্পষ্ট করেছে, সাধারণ বা স্বাভাবিক কথোপকথনের জন্য কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না। মূলত গোপন যোগাযোগ বা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এমন আচরণ ঠেকাতেই এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ফুটবলে ট্যাকটিক্যাল টাইমআউট নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। অনেক ম্যাচে দেখা যায়, কোনো খেলোয়াড় বিশেষ করে গোলকিপার চিকিৎসা নেওয়ার সময় অন্য খেলোয়াড়েরা টাচলাইনে গিয়ে কোচের কাছ থেকে নির্দেশনা শুনছেন।
ফিফার মতে, এতে খেলার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। পাশাপাশি এটি ম্যাচ চলাকালে অতিরিক্ত কৌশলগত বিরতির সুযোগ তৈরি করে, যা ফুটবলের মূল চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ৪৮টি দেশের প্রধান কোচদের নিয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে অনেকেই এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং খেলার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
যদিও এখনো এ বিষয়ে রেফারিদের হাতে নির্দিষ্ট কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দেওয়া হয়নি, তবে ফিফা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা এই প্রবণতা নিরুৎসাহিত করতে চায়। ভবিষ্যতে এ নিয়ে আরও স্পষ্ট নির্দেশনা আসতে পারে।
পিয়েরলুইজি কলিনা বলেছেন, গোলকিপার আহত হতে পারেন এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগে অন্য খেলোয়াড়দের মাঠ ছেড়ে কোচের সঙ্গে দলীয় বৈঠকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
ফিফার নতুন এসব সিদ্ধান্ত ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহারকে আরও বিস্তৃত করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ন্ত্রণ এবং খেলার গতি বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে একটি ভুল সিদ্ধান্ত অনেক সময় একটি দেশের স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে। তাই বিতর্ক কমিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ভিএআরের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে বলে মনে করছে ফুটবল বিশ্ব।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য নয়, রেফারিং ব্যবস্থার নতুন যুগের সূচনার কারণেও স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। নতুন নিয়মগুলো মাঠে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।






















