বিশ্বকাপ মূলত জাতীয় দলগুলোর প্রতিযোগিতা হলেও এর সঙ্গে ক্লাব ফুটবলের সম্পর্কও গভীর। কারণ বিশ্বের সেরা ফুটবলাররা বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলেন এবং বিশ্বকাপেও নিজেদের ছাপ রেখে যান। সেই হিসেবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোন ক্লাবের খেলোয়াড়রা সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন, এমন প্রশ্ন ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবো’র পরিসংখ্যানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘গাতো মেস্ত্রে’ বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাস বিশ্লেষণ করে এমনই একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা গেছে, ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা ক্লাব হলো জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ। বিশ্বকাপে বিভিন্ন সময়ে বায়ার্নের খেলোয়াড়রা মোট ৭৯টি গোল করেছেন।
তবে শীর্ষস্থানে থাকা বায়ার্নের সঙ্গে অন্য ক্লাবগুলোর ব্যবধান খুব বেশি নয়। স্পেনের বার্সেলোনা রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। বিশ্বকাপে বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের করা গোলসংখ্যা ৭৮। অর্থাৎ বায়ার্নের চেয়ে মাত্র এক গোল কম।
তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে আরেক স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ। বিশ্বকাপের বিভিন্ন আসরে রিয়ালের ফুটবলাররা জাতীয় দলের হয়ে মোট ৭৭টি গোল করেছেন। ফলে শীর্ষ তিনটি ক্লাবের মধ্যে ব্যবধান মাত্র দুই গোলের।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা ক্লাবগুলোর তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে ইতালির ইন্টার মিলান। ক্লাবটির খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপে মোট ৭১টি গোল করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব ফুটবলে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রে ইন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
শীর্ষ পাঁচের শেষ স্থানে রয়েছে ইতালির আরেক ঐতিহ্যবাহী ক্লাব জুভেন্টাস। বিশ্বকাপে জুভেন্টাসের খেলোয়াড়দের মোট গোলসংখ্যা ৫৯। ইউরোপের অন্যতম সফল ক্লাব হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলেও তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য।
মজার বিষয় হলো, বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা ক্লাবগুলোর প্রথম পাঁচটি স্থানই ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর দখলে। ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতায় ইউরোপের ক্লাবগুলোর আধিপত্য দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
তবে ইউরোপের বাইরে থাকা ক্লাবগুলোর মধ্যেও কয়েকটি দল উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে উরুগুয়ের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব পেনারোল। ১৩৪ বছরের পুরোনো এই ক্লাবের খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপে মোট ৩৯টি গোল করেছেন।
সব মহাদেশের ক্লাব মিলিয়ে পেনারোলের অবস্থান নবম। দক্ষিণ আমেরিকার ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী এই দলটি বহু বিশ্বমানের ফুটবলার উপহার দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতার প্রতিফলনই দেখা যায় বিশ্বকাপের গোলসংখ্যার তালিকায়।
ব্রাজিলের ক্লাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সফল ভাস্কো দা গামা। বিশ্বকাপের বিভিন্ন আসরে ক্লাবটির খেলোয়াড়রা জাতীয় দলের হয়ে মোট ২৯টি গোল করেছেন। ব্রাজিলের সমৃদ্ধ ফুটবল ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে ভাস্কোর এই অর্জন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বিশ্বব্যাপী ক্লাবগুলোর তালিকায় ভাস্কো দা গামার অবস্থান ১৪তম। যদিও ইউরোপীয় জায়ান্টদের সঙ্গে ব্যবধান রয়েছে, তারপরও দক্ষিণ আমেরিকার ক্লাব হিসেবে এটি একটি বড় অর্জন বলে বিবেচিত হয়।
আর্জেন্টিনার ক্লাবগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে রিভার প্লেট। বিশ্বকাপে রিভার প্লেটের খেলোয়াড়রা মোট ২২টি গোল করেছেন। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে ক্লাবটির অবদান দীর্ঘদিনের এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তা স্বীকৃত।
সব ক্লাবের সম্মিলিত তালিকায় রিভার প্লেটের অবস্থান ২৫তম। দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম সফল ক্লাব হিসেবে তারা বিশ্বকাপে নিজেদের উপস্থিতি বহুবার জানান দিয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বকাপ ইতিহাসে এ পর্যন্ত ৪৯২টি ক্লাবের খেলোয়াড় অন্তত একটি করে গোল করেছেন। এই সংখ্যা বিশ্ব ফুটবলের ব্যাপক বিস্তার এবং বিভিন্ন দেশের ক্লাবগুলোর অবদানকে তুলে ধরে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেললেও ফুটবলারদের বিকাশের পেছনে ক্লাবগুলোর অবদান সবচেয়ে বেশি। তাই বিশ্বকাপে ক্লাবভিত্তিক গোলের এই পরিসংখ্যান ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
আরও একটি বিষয় নজরে আসে, শীর্ষ ২৫ ক্লাবের তালিকায় এশিয়ার কোনো ক্লাব জায়গা করে নিতে পারেনি। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার ক্লাবগুলোর আধিপত্য সেখানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাস যত সমৃদ্ধ হচ্ছে, ততই বাড়ছে ক্লাবগুলোর অবদান নিয়ে আলোচনা। ভবিষ্যতের আসরগুলোতে নতুন নতুন তারকার উত্থানের মাধ্যমে এই তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে আপাতত বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা ক্লাব হিসেবে বায়ার্ন মিউনিখই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।























