আজ ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচটি শুধু দ্বিতীয় রাউন্ডের পথে আরেকটি ধাপ নয়, লিওনেল মেসির জন্য এটি হতে পারে ব্যক্তিগত ইতিহাস লেখার মঞ্চও। জন্মদিনের ঠিক আগমুহূর্তে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে তাঁর সামনে।
আগামী বুধবার ৩৯ বছরে পা দেবেন মেসি। বয়স বাড়লেও মাঠে তাঁর প্রভাব এতটুকু কমেনি। বরং প্রতিটি ম্যাচে তিনি যেন নতুন কোনো গল্প লিখে যাচ্ছেন, যা ফুটবল ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করছে।
কানসাস সিটিতে আর্জেন্টিনার অনুশীলন শিবির প্রায় পুরোপুরি রুদ্ধদ্বার। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী অল্প সময়ের জন্য সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার থাকলেও দলের প্রস্তুতির বেশির ভাগ অংশ গোপন রাখা হচ্ছে।
তবুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কিছু মুহূর্ত সমর্থকদের সামনে চলে আসছে। আর্জেন্টাইন ফুটবল সংস্থার সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া সম্প্রতি এমনই একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, দলের অনুশীলন ক্যাম্পে ছোট্ট এক আনন্দঘন আয়োজন চলছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কর্ডোভার কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী কার্লোস ‘লা মোনা’ হিমিনেজ।
গান শেষে মেসিকে হাসিমুখে শিল্পীর সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘তুমি অসাধারণ, তুমি গ্রেটদের একজন।’ কথাটি শিল্পীকে উদ্দেশ্য করে বলা হলেও অনেকের মতে, একই কথা মেসির ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
বিশ্বকাপের মাঝেও মেসির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা চলছে। কারণ মাঠের বাইরে তাঁর পরিবার বর্তমানে একটি কঠিন সময় পার করছে।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে গোল করার পর মেসিকে আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায়। পরে তিনি নিজেই ইঙ্গিত দেন, ব্যক্তিগত কিছু বিষয় তাঁকে ভেতর থেকে নাড়া দিচ্ছে।
এরপর জানা যায়, তাঁর বাবা হোর্হে মেসি শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। ৬৮ বছর বয়সী হোর্হে বর্তমানে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বাবার অসুস্থতার খবরের মাঝেই মেসি মাঠে নিজের কাজটা করেছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে তিনি হ্যাটট্রিক করে দলকে বড় জয় এনে দেন।
অনেকেই মনে করেন, মেসির আবেগ প্রকাশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ফুটবল। নিজের অনুভূতি তিনি কথার চেয়ে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বেশি তুলে ধরেন।
এবারের বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬-তে। এর মাধ্যমে তিনি জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন।
আর মাত্র একটি গোল করলেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে একক সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসবেন তিনি। জন্মদিনের আগেই যদি সেই রেকর্ড আসে, তাহলে সেটি হয়ে উঠবে আরও বিশেষ।
অবশ্য সেই পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে অস্ট্রিয়া। ইউরোপের দলটি সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
দলের দায়িত্বে আছেন অভিজ্ঞ জার্মান কোচ রালফ রাংনিক। আধুনিক ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ‘গেগেনপ্রেসিং’-এর অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে।
এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিপক্ষের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করা। যাতে তারা আক্রমণ গড়ে তোলার সুযোগ না পায়।
বর্তমান প্রজন্মের অনেক সফল কোচের দর্শনের পেছনেও রাংনিকের প্রভাব রয়েছে। ইয়ুর্গেন ক্লপের ফুটবল দর্শনের সঙ্গেও তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
প্রথম ম্যাচে জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রিয়া। শেষ মুহূর্তে মার্কো আরনাউতোভিচের পেনাল্টি গোল তাদের লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে।
অস্ট্রিয়ার অধিনায়ক ডেভিড আলাবা ম্যাচের আগে যথেষ্ট সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর মতে, আর্জেন্টিনার শক্তি শুধু একজন খেলোয়াড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
আলাবা বলেছেন, আর্জেন্টিনা একটি পূর্ণাঙ্গ দল। তাই মেসিকে আটকানো গেলেও ম্যাচ সহজ হয়ে যাবে, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে তরুণ মিডফিল্ডার পল ভানারও আত্মবিশ্বাসী। তিনি জানিয়েছেন, তারা প্রতিপক্ষকে সম্মান করে, কিন্তু ভয় পায় না।
এ ধরনের মন্তব্য মেসিকে ঘিরে নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে একই ধরনের কথা শোনা গেছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেসি নিজের পথেই হেঁটেছেন। সমালোচনা, চাপ কিংবা চ্যালেঞ্জ তাঁকে থামাতে পারেনি।
আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়ার মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসও খুব দীর্ঘ নয়। দুই দলের দেখা হয়েছে মাত্র দুটি ম্যাচে।
সর্বশেষ ১৯৯০ সালে ভিয়েনায় একটি প্রীতি ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করেছিল দুই দল। তারও আগে ১৯৮০ সালে একই শহরে ৫-১ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
সেই ম্যাচে ডিয়েগো ম্যারাডোনা করেছিলেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একমাত্র হ্যাটট্রিক। অনেক সমর্থকই ইতিহাসের এই মিলকে শুভ সংকেত হিসেবে দেখছেন।
এদিকে আর্জেন্টিনা দলে কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। গঞ্জালো মন্তিয়েল পেশির সমস্যায় ভুগছেন বলে তাঁর খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সে ক্ষেত্রে ডান প্রান্তে নাহুয়েল মলিনাকে দেখা যেতে পারে। বাম দিকে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোও প্রথম একাদশে সুযোগ পেতে পারেন।
আক্রমণভাগেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। লাওতারো মার্তিনেজের বদলে শুরু থেকেই হুলিয়ান আলভারেজকে নামানো হতে পারে।
তবে একটি জায়গা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। সেই জায়গাটি লিওনেল মেসির।
আলজেরিয়া তাঁকে খেলার অনেক জায়গা দিয়েছিল। কিন্তু অস্ট্রিয়া হয়তো সেই সুযোগ একেবারেই দেবে না।
তবুও মেসির পুরো ক্যারিয়ার প্রমাণ করে, জায়গা না পেলেও তিনি নিজেই জায়গা তৈরি করে নিতে পারেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় তাঁর নতুন নতুন গল্প।
রোসারিওর সেই ছেলেটি এবার ৩৯ বছরে পা দিতে চলেছেন। আর জন্মদিনের সবচেয়ে বড় উপহারটি হয়তো তিনি নিজেকেই দিতে প্রস্তুত।
সেই উপহার হতে পারে নতুন একটি গোল, নতুন একটি রেকর্ড এবং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে আরেকটি অমর অধ্যায়ের সূচনা।


























