ঢাকা ০৩:২৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ম্যানহোলে পড়ে নারীর মৃত্যু: এক রোমাঞ্চকর ও হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির নেপথ্য কাহিনী

গাজীপুরে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযান। ছবি: সংগৃহীত

ম্যানহোলে পড়ে নারীর মৃত্যুর এক চরম হৃদয়বিদারক ও রোমাঞ্চকর ঘটনাটি ঘটেছে গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া বাইপাস সংলগ্ন এলাকায়, যেখানে রোববার বিকেলে এক পশলা ভারী বৃষ্টির পর রাস্তার পাশে জমে থাকা পানির নিচে লুকিয়ে থাকা ঢাকনাবিহীন একটি মরণফাঁদে পা দিতেই মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যান মোছা. নাজমা খাতুন (২৪) নামের এক দুর্ভাগ্যগ্রস্ত নারী কর্মী। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস এর একটি চৌকস উদ্ধারকারী দল দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রচণ্ড বেগবান স্রোতের মাঝে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে শেষ পর্যন্ত ওই নারীর নিথর দেহটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

নিহত নাজমা খাতুন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার প্রত্যন্ত লাংগলঝাড় এলাকার বাসিন্দা আব্দুল বারীর মেয়ে হলেও তিনি জীবিকার তাগিদে এই শিল্পনগরীর ঠিক কোথায় বসবাস করতেন কিংবা কোন সংস্থায় কর্মরত ছিলেন সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গাজীপুর জেলা পুলিশ কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, বিকেলের প্রবল বর্ষণে পুরো সড়ক ও সংলগ্ন ফুটপাত যখন কর্দমাক্ত পানিতে সম্পূর্ণ সায়লাব হয়ে যায়, ঠিক তখনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ফুটপাতের নিচে ওত পেতে থাকা খোলা গর্তের প্রবল ঘূর্ণিস্রোতে তিনি নিমেষেই অদৃশ্য হয়ে যান।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা এই মর্মান্তিক দৃশ্যটি অবলোকন করার সাথে সাথেই নিজস্ব উদ্যোগে বাঁশ ও দড়ি নিয়ে উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা চালান এবং কোনো উপায় না পেয়ে দ্রুততার সাথে ভোগড়া মডার্ন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে খবর দিলে উদ্ধারকর্মীরা বিশেষ ডুবুরি দলসহ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে তল্লাশি শুরু করেন। দীর্ঘ সময় ধরে কর্দমাক্ত ও নোংরা পানির নিচে তল্লাশি চালিয়ে অবশেষে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেই গভীর গর্তের ভেতর থেকে মৃত অবস্থায় তাকে টেনে বের করতে সমর্থ হন এবং পরবর্তীতে বাসন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোখলেসুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পুলিশ দল সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে।

উল্লেখ্য যে, এই ঘনবসতিপূর্ণ এবং ব্যস্ততম শিল্পনগরীর বিভিন্ন এলাকায় সুদীর্ঘকাল ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা খোলা ড্রেন ও ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে পড়ে নিরীহ পথচারীদের অকাল মৃত্যুর এই ভয়ঙ্কর সিলসিলা বা পুনরাবৃত্তি নতুন কিছু নয়, কারণ এর আগেও বিগত ২০২৫ সালের জুলাই মাসে টঙ্গীর হোন্ডা রোড বা হোসেন মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় একইভাবে ফারিয়া তাছনিম জ্যোতি নামের এক নারী নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টা পর শালিকচূড়া বিল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল।

তৎকালীন সময়ে ওই ভয়াবহ ও রোমাঞ্চকর দুর্ঘটনার পর সচেতন নাগরিক সমাজের তীব্র আন্দোলনের মুখে দেশের উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং সমস্ত ম্যানহোলে ঢাকনা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে কঠোর আইনি নির্দেশনা এবং চরম আলটিমেটাম জারি করেছিল।

তবুও প্রশাসনিক অবহেলা, নিয়মিত তদারকির অভাব এবং যথাযথ সংস্কারকাজের চরম গাফিলতির কারণে আজ আবারও একজন সাধারণ মানুষের অমূল্য জীবন প্রদীপ এভাবে মাঝরাস্তায় নিভে যাওয়ায় পুরো গাজীপুর জেলা জুড়ে সাধারণ জনগণের মাঝে তীব্র ক্ষোভের পাশাপাশি নিজেদের দৈনন্দিন নিরাপত্তা নিয়ে এক বিরাট ও গভীর প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ম্যানহোলে পড়ে নারীর মৃত্যু: এক রোমাঞ্চকর ও হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির নেপথ্য কাহিনী

Update Time : ০৯:৫২:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

ম্যানহোলে পড়ে নারীর মৃত্যুর এক চরম হৃদয়বিদারক ও রোমাঞ্চকর ঘটনাটি ঘটেছে গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া বাইপাস সংলগ্ন এলাকায়, যেখানে রোববার বিকেলে এক পশলা ভারী বৃষ্টির পর রাস্তার পাশে জমে থাকা পানির নিচে লুকিয়ে থাকা ঢাকনাবিহীন একটি মরণফাঁদে পা দিতেই মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যান মোছা. নাজমা খাতুন (২৪) নামের এক দুর্ভাগ্যগ্রস্ত নারী কর্মী। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস এর একটি চৌকস উদ্ধারকারী দল দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রচণ্ড বেগবান স্রোতের মাঝে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে শেষ পর্যন্ত ওই নারীর নিথর দেহটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

নিহত নাজমা খাতুন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার প্রত্যন্ত লাংগলঝাড় এলাকার বাসিন্দা আব্দুল বারীর মেয়ে হলেও তিনি জীবিকার তাগিদে এই শিল্পনগরীর ঠিক কোথায় বসবাস করতেন কিংবা কোন সংস্থায় কর্মরত ছিলেন সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গাজীপুর জেলা পুলিশ কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, বিকেলের প্রবল বর্ষণে পুরো সড়ক ও সংলগ্ন ফুটপাত যখন কর্দমাক্ত পানিতে সম্পূর্ণ সায়লাব হয়ে যায়, ঠিক তখনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ফুটপাতের নিচে ওত পেতে থাকা খোলা গর্তের প্রবল ঘূর্ণিস্রোতে তিনি নিমেষেই অদৃশ্য হয়ে যান।

আরও পড়ুন  শুক্রবার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা এই মর্মান্তিক দৃশ্যটি অবলোকন করার সাথে সাথেই নিজস্ব উদ্যোগে বাঁশ ও দড়ি নিয়ে উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা চালান এবং কোনো উপায় না পেয়ে দ্রুততার সাথে ভোগড়া মডার্ন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে খবর দিলে উদ্ধারকর্মীরা বিশেষ ডুবুরি দলসহ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে তল্লাশি শুরু করেন। দীর্ঘ সময় ধরে কর্দমাক্ত ও নোংরা পানির নিচে তল্লাশি চালিয়ে অবশেষে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেই গভীর গর্তের ভেতর থেকে মৃত অবস্থায় তাকে টেনে বের করতে সমর্থ হন এবং পরবর্তীতে বাসন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোখলেসুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পুলিশ দল সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে।

আরও পড়ুন  ৪০ দিন আমাজনের জঙ্গলে, চার শিশুর বেঁচে থাকার অবিশ্বাস্য গল্প

উল্লেখ্য যে, এই ঘনবসতিপূর্ণ এবং ব্যস্ততম শিল্পনগরীর বিভিন্ন এলাকায় সুদীর্ঘকাল ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা খোলা ড্রেন ও ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে পড়ে নিরীহ পথচারীদের অকাল মৃত্যুর এই ভয়ঙ্কর সিলসিলা বা পুনরাবৃত্তি নতুন কিছু নয়, কারণ এর আগেও বিগত ২০২৫ সালের জুলাই মাসে টঙ্গীর হোন্ডা রোড বা হোসেন মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় একইভাবে ফারিয়া তাছনিম জ্যোতি নামের এক নারী নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টা পর শালিকচূড়া বিল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাবেক সংসদ সদস্য হারুন-আল-রশীদের ইন্তেকাল।

তৎকালীন সময়ে ওই ভয়াবহ ও রোমাঞ্চকর দুর্ঘটনার পর সচেতন নাগরিক সমাজের তীব্র আন্দোলনের মুখে দেশের উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং সমস্ত ম্যানহোলে ঢাকনা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে কঠোর আইনি নির্দেশনা এবং চরম আলটিমেটাম জারি করেছিল।

তবুও প্রশাসনিক অবহেলা, নিয়মিত তদারকির অভাব এবং যথাযথ সংস্কারকাজের চরম গাফিলতির কারণে আজ আবারও একজন সাধারণ মানুষের অমূল্য জীবন প্রদীপ এভাবে মাঝরাস্তায় নিভে যাওয়ায় পুরো গাজীপুর জেলা জুড়ে সাধারণ জনগণের মাঝে তীব্র ক্ষোভের পাশাপাশি নিজেদের দৈনন্দিন নিরাপত্তা নিয়ে এক বিরাট ও গভীর প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।