ঢাকা ০৮:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ট্রাম্পের বড় ইউটার্ন! ইরান যুদ্ধ থামাতে কেন চাপে যুক্তরাষ্ট্র?

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৭:২১:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
  • ৫১৬

ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ ইস্যুতে আলোচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছেন। পরিবর্তে উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান যুদ্ধের সমাধান করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে রয়েছে।

গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব ধরনের জাহাজকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। তিনি আরও জানান, এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রতিপক্ষ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জাহাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কারণ, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ বৈশ্বিক বাণিজ্য ও তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারত। অনেক বিশেষজ্ঞ তখনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে এমন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।

তবে ঘোষণার একদিন পরই ট্রাম্প আগের অবস্থান থেকে সরে আসেন। নতুন প্রস্তাবে তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করবে, তাদের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচলের সুবিধা দেওয়া হবে। এতে শুল্ক আরোপের পরিবর্তে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এমন নীতিগত পরিবর্তন স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর চাপ, বৈশ্বিক বাজারের উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার কারণেই ট্রাম্পকে দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়েছে। এতে ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থান নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অবসান ঘটাতে প্রায় এক মাস আগে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তির মাধ্যমে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি শান্তি আলোচনার পথও তৈরি হয়। কিন্তু একাধিক দফায় আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধানের কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বরং সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বেড়েছে। বিভিন্ন কূটনৈতিক বক্তব্য এবং সামরিক প্রস্তুতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে, কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং আমেরিকার বাজারেও এর প্রভাব পড়বে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকে অনেকেই বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি কমানোর একটি কৌশল হিসেবেও দেখছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসন এখন একদিকে ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে মিত্র দেশগুলোর আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তাই সরাসরি শুল্ক আরোপের বদলে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় রাখার নতুন কৌশল বলেও মনে করছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ট্রাম্পের দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন ইরান যুদ্ধের জটিল বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা, কূটনৈতিক আলোচনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্বার্থ—সবকিছুর ভারসাম্য রক্ষা এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

জনপ্রিয় সংবাদ

ট্রাম্পের বড় ইউটার্ন! ইরান যুদ্ধ থামাতে কেন চাপে যুক্তরাষ্ট্র?

Update Time : ০৭:২১:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছেন। পরিবর্তে উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান যুদ্ধের সমাধান করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে রয়েছে।

গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব ধরনের জাহাজকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। তিনি আরও জানান, এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রতিপক্ষ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জাহাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কারণ, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ বৈশ্বিক বাণিজ্য ও তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারত। অনেক বিশেষজ্ঞ তখনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে এমন সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।

আরও পড়ুন  মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন স্থাপনাগুলোতে ইরানের হামলা

তবে ঘোষণার একদিন পরই ট্রাম্প আগের অবস্থান থেকে সরে আসেন। নতুন প্রস্তাবে তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করবে, তাদের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচলের সুবিধা দেওয়া হবে। এতে শুল্ক আরোপের পরিবর্তে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এমন নীতিগত পরিবর্তন স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর চাপ, বৈশ্বিক বাজারের উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার কারণেই ট্রাম্পকে দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়েছে। এতে ইরানকে ঘিরে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থান নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন  ওবামার বিরুদ্ধে ইরানকে ‘ঘুষ’ দেওয়ার অভিযোগ ট্রাম্পের

চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অবসান ঘটাতে প্রায় এক মাস আগে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তির মাধ্যমে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি শান্তি আলোচনার পথও তৈরি হয়। কিন্তু একাধিক দফায় আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধানের কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বরং সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বেড়েছে। বিভিন্ন কূটনৈতিক বক্তব্য এবং সামরিক প্রস্তুতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে, কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপ, এশিয়া এবং আমেরিকার বাজারেও এর প্রভাব পড়বে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকে অনেকেই বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি কমানোর একটি কৌশল হিসেবেও দেখছেন।

আরও পড়ুন  চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের ১০৯ তলা ভবন বিমান বিধস্ত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসন এখন একদিকে ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে মিত্র দেশগুলোর আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তাই সরাসরি শুল্ক আরোপের বদলে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় রাখার নতুন কৌশল বলেও মনে করছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ট্রাম্পের দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন ইরান যুদ্ধের জটিল বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা, কূটনৈতিক আলোচনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্বার্থ—সবকিছুর ভারসাম্য রক্ষা এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।