সেন্টমার্টিন নিয়ে সিদ্ধান্ত বহাল থাকছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু। সরকারের নেওয়া আগের নীতির ধারাবাহিকতায় দ্বীপে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু থাকবে বলে তিনি স্পষ্ট করেন। গত বৃহস্পতিবার তার বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করে ডয়চে ভেলে। এতে সেন্টমার্টিনের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিবেশমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় পর্যটন বন্ধ রাখার ফলে সেন্টমার্টিন দ্বীপের পরিবেশগত অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। সরেজমিনে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে বলেও তিনি জানান। দ্বীপের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ফলে বর্তমান নীতি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।
তিনি জানান, প্রায় সাত বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে ২০২৪ সালে সরকার পর্যটন নিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত নীতি গ্রহণ করে। সেই নীতির আওতায় বছরে নির্দিষ্ট সময় সীমিত পর্যটক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। এতে দ্বীপকে রক্ষার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণের সুযোগ রাখা হয়েছে। সেন্টমার্টিন নিয়ে সিদ্ধান্ত বহাল রাখার অংশ হিসেবে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র তিন মাস পর্যটকদের দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে। এই সময় প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক প্রবেশ করতে পারেন। এর বেশি মানুষের চাপ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছে সরকার। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি অনুমতি দেওয়া হয় না।
ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত টানা নয় মাস দ্বীপে পর্যটন বন্ধ রাখা হয়। এই সময় সেন্টমার্টিন তার স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে আসার সুযোগ পায় বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। মানুষের চাপ কমে যাওয়ায় সামুদ্রিক প্রাণী, প্রবাল এবং উদ্ভিদের পুনরুদ্ধার ঘটে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরে পেতে এই সময়সীমা কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে দাবি সরকারের। পরিবেশমন্ত্রী বলেন, তিন মাসের বেশি সময় পর্যটন চালু থাকলে সেন্টমার্টিন দ্বীপের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে। দ্বীপটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল সংশ্লিষ্ট এলাকা হওয়ায় এর গুরুত্ব অনেক বেশি। প্রাকৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে এটি শুধু ভ্রমণকেন্দ্র নয়, জাতীয় সম্পদও বটে। তাই স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পর্যটন নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দ্বীপকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। অতিরিক্ত মানুষ, প্লাস্টিক বর্জ্য, শব্দদূষণ এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা দ্বীপের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। তাই বর্তমান নীতি চালু রাখা জরুরি বলে মত দেন তিনি।সরকারি সূত্রগুলো বলছে, পর্যটন সীমিত করার পর দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। সমুদ্রতীর পরিষ্কার হয়েছে, বর্জ্যের পরিমাণ কমেছে এবং জীববৈচিত্র্য কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। বিশেষ করে প্রবাল অঞ্চলে মানুষের হস্তক্ষেপ কমে যাওয়ায় সামুদ্রিক পরিবেশ উপকৃত হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে সেন্টমার্টিন নিয়ে সিদ্ধান্ত বহাল রাখার বিপক্ষে স্থানীয়দের একটি অংশ আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, দ্বীপের অধিকাংশ মানুষের প্রধান আয়ের উৎস পর্যটনশিল্প। ভ্রমণ সীমিত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য কমে গেছে। হোটেল, নৌযান, খাবার দোকান এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অনেক পরিবার এখন আর আগের মতো আয় করতে পারছে না। মৌসুমি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল মানুষ বছরের বাকি সময় কর্মহীন থাকছেন। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের আয়ও নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া কোনো একপক্ষকে গুরুত্ব দিলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। তাই বিকল্প কর্মসংস্থান ও টেকসই পর্যটনের পরিকল্পনা জরুরি। পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল পর্যটনই হতে পারে সেরা সমাধান। সীমিত সংখ্যক পর্যটক, কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব আবাসন এবং স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ দিলে উভয় দিকই রক্ষা করা সম্ভব। এতে দ্বীপের ক্ষতি কমবে এবং স্থানীয়রাও আয় করতে পারবেন।
সেন্টমার্টিন নিয়ে সিদ্ধান্ত বহাল রাখার ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ পরিবেশ রক্ষার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার কেউ স্থানীয় অর্থনীতির দুরবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। অনেকেই মনে করছেন, পরিবেশ রক্ষা ও মানুষের জীবিকা—দুই বিষয়েই সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। সব মিলিয়ে সেন্টমার্টিন নিয়ে সিদ্ধান্ত বহাল রেখে সরকার দ্বীপের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় বিকল্প পরিকল্পনাও এখন সময়ের দাবি। পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করেই সেন্টমার্টিনের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।























