মাংস সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার হলেও সঠিক নিয়মে রান্না না করলে এর পুষ্টিগুণ কমে যেতে পারে, এমনকি স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাংস রান্নার সময় তেল-চর্বির ব্যবহার, রান্নার তাপমাত্রা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঈদ বা পারিবারিক আয়োজনের সময় অতিরিক্ত মাংস খাওয়া ও ভুল রান্নার অভ্যাস নানা ধরনের শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারি কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ও পুষ্টিবিদ অধ্যাপক শম্পা শারমিন খান জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যকর উপায়ে মাংস রান্না করলে এর স্বাদ ও পুষ্টি দুটোই বজায় রাখা সম্ভব। তিনি বলেন, একটু সচেতন হলেই মাংস খাওয়ার কারণে সৃষ্ট অনেক ঝুঁকি এড়িয়ে চলা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাংস রান্নার সময় প্রথমেই চর্বি কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। গরু বা খাসির মাংসে যে দৃশ্যমান চর্বি থাকে, তা যতটা সম্ভব কেটে ফেলা উচিত। এতে অতিরিক্ত ফ্যাট শরীরে প্রবেশ কমবে এবং হৃদ্রোগসহ নানা জটিলতার ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।
রান্নায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন পুষ্টিবিদরা। অনেকেই মনে করেন মাংস রান্নায় বেশি তেল না দিলে স্বাদ কমে যায়, কিন্তু বাস্তবে মাংসের নিজস্ব চর্বি থেকেই পর্যাপ্ত তেল বের হয়। ফলে আলাদা তেলের প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রেই কম পড়ে।
বিশেষ করে লাল মাংস রান্নার সময় তেল ছাড়া রান্না করলেও মাংসের ভেতর থেকে যে চর্বি বের হয়, তা দিয়েই রান্না সম্ভব। এতে খাবার তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর থাকে এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে জমার আশঙ্কা কমে।
চিকিৎসকরা ডুবো তেলে ভাজা মাংসের পদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবারে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ভাজাভুজির বদলে ভিন্ন ধরনের মসলা ব্যবহার করে সুস্বাদু রান্না করা যেতে পারে।
অনেকে গ্রিল বা ঝলসানো মাংস খেতে পছন্দ করেন। তবে মাংস অতিরিক্ত পুড়ে কালো হয়ে গেলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোড়া অংশে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এ কারণে ঝলসানো বা গ্রিল করা মাংস মৃদু আঁচে ধীরে ধীরে রান্না করা উচিত। এতে মাংসের ভেতরের অংশও ভালোভাবে সেদ্ধ হয় এবং বাইরের অংশ অতিরিক্ত পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।
মাংস ঝলসানোর আগে সেটিকে বিভিন্ন মসলা, আদা, রসুন বা টক দই দিয়ে মেরিনেট করে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন পুষ্টিবিদরা। এতে মাংস নরম হয়, স্বাদ বাড়ে এবং রান্নার সময় পুষ্টিও অনেকটা অক্ষুণ্ণ থাকে।
মাংস রান্নার ক্ষেত্রে উচ্চ তাপমাত্রা ব্যবহার না করাই ভালো। অতিরিক্ত তাপে দ্রুত রান্না করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে রান্না করলে স্বাদ ও পুষ্টি দুটোই বজায় থাকে।
ব্যস্ততার কারণে দ্রুত রান্না করতে চাইলে প্রেশার কুকার ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে কম সময়ে মাংস সেদ্ধ হয় এবং অতিরিক্ত জ্বাল দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ফলে পুষ্টি উপাদানও তুলনামূলকভাবে বেশি সংরক্ষিত থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পশু জবাইয়ের তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে মাংস রান্না করা সবচেয়ে ভালো। দীর্ঘ সময় ফেলে রাখলে কিছু পুষ্টি উপাদান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
মাংস রান্নার সময় পাত্র ঢেকে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে বাষ্পের সঙ্গে পুষ্টি উপাদান বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। একই সঙ্গে মাংস দ্রুত ও সমানভাবে সেদ্ধ হয়।
অনেকে মাংস দীর্ঘ সময় জ্বাল দিয়ে শুকনো বা ঝুরি ধরনের রান্না করতে পছন্দ করেন। এতে স্বাদ বাড়লেও অতিরিক্ত তাপে কিছু প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে ঝোলযুক্ত মাংসের পদ তুলনামূলকভাবে বেশি পুষ্টিকর। কারণ রান্নার সময় যে পুষ্টি উপাদান বের হয়, তা ঝোলের মধ্যেই থেকে যায়। ফলে খাবারের পুষ্টিমান অনেকাংশে অটুট থাকে।
মাংসের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সবজি যোগ করে রান্না করলে খাবার আরও স্বাস্থ্যকর হয়। এতে মাংসের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয় এবং শরীর প্রয়োজনীয় আঁশ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানও পায়।
শাশলিক বা কাবাবজাতীয় পদে মাংসের সঙ্গে ক্যাপসিকাম, টমেটো, পেঁয়াজ কিংবা গাজর ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে খাবারের রং ও স্বাদ বাড়ে, পাশাপাশি শিশুরাও আগ্রহ নিয়ে সবজি খেতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়েও বিশেষ সতর্কতা জরুরি বলে জানিয়েছেন পুষ্টিবিদরা। মাংস অবশ্যই ভালোভাবে সেদ্ধ করতে হবে। কাঁচা বা আধাসেদ্ধ মাংসে ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু থেকে যেতে পারে, যা পেটের সমস্যা বা খাদ্যবিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে।
কাঁচা মাংস ও রান্না করা মাংস কখনো একসঙ্গে রাখা উচিত নয়। কাঁচা মাংসের রক্ত বা জীবাণু রান্না করা খাবারে লাগলে তা থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যে ছুরি, বঁটি, চপিং বোর্ড বা পাত্রে কাঁচা মাংস রাখা হয়েছে, সেগুলো ব্যবহার শেষে ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে। না ধুয়ে অন্য খাবার কাটলে জীবাণু সহজেই ছড়িয়ে যেতে পারে।
কাঁচা মাংস ধরার আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যবিধির এই সাধারণ অভ্যাস অনেক ধরনের জীবাণু সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা ছোট টুকরো করে মাংস রান্নার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে মাংস দ্রুত ও সমানভাবে সেদ্ধ হয়। একই সঙ্গে মসলা ভালোভাবে ভেতরে প্রবেশ করায় স্বাদও বাড়ে।
মাংস যতই পুষ্টিকর হোক, তা পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পুষ্টিবিদরা। অতিরিক্ত মাংস খেলে হজমের সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি এবং কোলেস্টেরল বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পশুর কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে। বিশেষ করে মগজ, পায়া, পাঁজর, মজ্জা, মাথা, মাথার হাড়, গলা ও ভুঁড়িতে উচ্চমাত্রার ফ্যাট থাকে। তাই এসব খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
নেহারি বা অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ঝোলজাতীয় খাবারও সীমিত পরিমাণে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এসব খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে।
এ ছাড়া রানের মাংস, কলিজা ও ফুসফুসও অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে কলিজায় কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকায় হৃদ্রোগ বা উচ্চ কোলেস্টেরলে ভোগা ব্যক্তিদের সতর্ক থাকতে হবে।
যাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা রয়েছে, যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, কিডনির রোগ বা স্থূলতা, তাদের জন্য মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা মেনে চলা উচিত।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, সচেতনভাবে রান্না ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখলে মাংস হতে পারে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ খাবার। সঠিক উপায়ে রান্না করলে স্বাদ, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য—তিনটিই একসঙ্গে নিশ্চিত করা সম্ভব।























