ঢাকা ১২:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চিকিৎসক থেকে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার: মাহাথির মোহাম্মদ ১০১

১০১ বছরে পা রাখা মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ

১০১ বছরে পা রাখলেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। একজন চিকিৎসক থেকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা এবং আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হিসেবে তাঁর যাত্রা আজও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষকদের কাছে আলোচনার বিষয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যেমন তিনি দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তেমনি তাঁর শাসনামলকে ঘিরে রয়েছে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা। জন্মদিনের এই বিশেষ দিনে ফিরে দেখা যাক মাহাথির মোহাম্মদের জীবন, নেতৃত্ব, উন্নয়ন দর্শন এবং উত্তরাধিকার।

১৯২৫ সালের ১০ জুলাই মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্যের আলোর সেটারে জন্মগ্রহণ করেন মাহাথির বিন মোহাম্মদ। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মাহাথির ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের ১০ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর বাবা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী, পরিশ্রমী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন, যা পরবর্তী জীবনে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেও প্রতিফলিত হয়।

উচ্চশিক্ষায় তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান বেছে নেন এবং ১৯৫৩ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কয়েক বছর সরকারি চাকরি করার পর নিজ এলাকায় একটি ব্যক্তিগত ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। সেখান থেকেই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘ডা. এম’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। চিকিৎসক হিসেবে মানুষের জীবন ও সমাজকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতাই তাঁকে রাজনীতিতে আসতে অনুপ্রাণিত করে।

মাহাথিরের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে ইউনাইটেড মালয়াস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও)-এ যোগদানের মাধ্যমে। স্বাধীনতা-পরবর্তী মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে দলটি ছিল অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন। দলের হয়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন মাহাথির এবং ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন।

তবে তাঁর রাজনৈতিক পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। ১৯৬৯ সালে দলীয় অবস্থানের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে তাঁকে ইউএমএনও থেকে বহিষ্কার করা হয়। অনেকের ধারণা ছিল, এখানেই তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটি। ১৯৭২ সালে তিনি আবার দলে ফিরে আসেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

১৯৭৪ সালে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি মন্ত্রিসভায় স্থান পান। প্রথমে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৭৬ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী হন। অবশেষে ১৯৮১ সালে মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময় থেকেই শুরু হয় দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ ও প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রিত্বের অধ্যায়।

প্রথম দফায় টানা ২২ বছর, অর্থাৎ ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মাহাথির। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি মালয়েশিয়াকে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে, শিল্পায়ন গতি পায় এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতি গড়ে ওঠে।

মাহাথিরের আমলে মালয়েশিয়ায় একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। রাজধানী কুয়ালালামপুরে নির্মিত পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পুত্রাজায়া প্রশাসনিক নগরী এবং নর্থ-সাউথ এক্সপ্রেসওয়ে তাঁর উন্নয়ন দর্শনের প্রতীক হয়ে ওঠে। এসব প্রকল্প শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মালয়েশিয়ার ভাবমূর্তি গড়তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৯১ সালে তিনি ঘোষণা করেন বহুল আলোচিত ‘ভিশন ২০২০’। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়াকে একটি উন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করা। যদিও সব লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি, তবুও এই পরিকল্পনা মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।

মাহাথিরের নেতৃত্বে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটে। দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার ঘটে, কর্মসংস্থান বাড়ে, দারিদ্র্যের হার কমে এবং মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এসব কারণেই তাঁকে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার বলা হয়।

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুধু প্রশংসায় সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী মত দমন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, বিচার বিভাগের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের অভিযোগও ওঠে। বিশেষ করে ১৯৮৭ সালের ‘অপারেশন লালাং’ এবং ১৯৮৮ সালের বিচার বিভাগীয় সংকট তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

মাহাথিরের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল তাঁর সাবেক সহযোগী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। একসময় যাঁকে নিজের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হতো, সেই আনোয়ারকে ১৯৯৮ সালে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সমকামিতার অভিযোগ আনা হয়। আনোয়ার দাবি করেন, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা হয়।

২০০৩ সালে ২২ বছরের দীর্ঘ শাসনের পর মাহাথির স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন। অনেকেই মনে করেছিলেন, এবার হয়তো তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি অবসর নেবেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসন নিয়ে নিয়মিত মতামত দিতে থাকেন এবং জাতীয় ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

দীর্ঘ ১৫ বছর পর ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটে মাহাথিরের। তখন তাঁর বয়স ৯২ বছর। দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে বিরোধী জোট গঠন করে নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবারও দায়িত্ব গ্রহণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন মাহাথির।

তবে দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রিত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রাজনৈতিক জোটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ২০২০ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। এর মাধ্যমে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে। এরপরও তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে যাননি এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে নিজের মতামত প্রকাশ করে যাচ্ছেন।

২০২২ সালের নির্বাচনে তিনি নিজের সংসদীয় আসন হারান, যা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় ধাক্কা। তবুও তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য দিচ্ছেন। বয়সের ভার তাঁকে থামাতে পারেনি।

বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়েও মাহাথির সক্রিয় জীবনযাপন করছেন। কয়েকবার হার্টের অস্ত্রোপচার, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং চলতি বছরে পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার পরও তিনি জনজীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। তাঁর মতে, “কাজই সবচেয়ে ভালো ওষুধ।”

১০১ বছরে পদার্পণ করেও মাহাথির মোহাম্মদ বিশ্ব রাজনীতির এক অনন্য অধ্যায়। কেউ তাঁকে উন্নয়নের স্থপতি বলেন, আবার কেউ তাঁর শাসনকে কর্তৃত্ববাদী হিসেবে মূল্যায়ন করেন। কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আধুনিক মালয়েশিয়ার অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা ও শিল্পায়নের ভিত্তি নির্মাণে তাঁর অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর নীতি, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের জন্য গবেষণা ও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চিকিৎসক থেকে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার: মাহাথির মোহাম্মদ ১০১

Update Time : ০৮:৫৯:১০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

১০১ বছরে পা রাখলেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। একজন চিকিৎসক থেকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা এবং আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হিসেবে তাঁর যাত্রা আজও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষকদের কাছে আলোচনার বিষয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যেমন তিনি দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তেমনি তাঁর শাসনামলকে ঘিরে রয়েছে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা। জন্মদিনের এই বিশেষ দিনে ফিরে দেখা যাক মাহাথির মোহাম্মদের জীবন, নেতৃত্ব, উন্নয়ন দর্শন এবং উত্তরাধিকার।

১৯২৫ সালের ১০ জুলাই মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্যের আলোর সেটারে জন্মগ্রহণ করেন মাহাথির বিন মোহাম্মদ। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মাহাথির ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের ১০ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর বাবা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী, পরিশ্রমী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন, যা পরবর্তী জীবনে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেও প্রতিফলিত হয়।

উচ্চশিক্ষায় তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান বেছে নেন এবং ১৯৫৩ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কয়েক বছর সরকারি চাকরি করার পর নিজ এলাকায় একটি ব্যক্তিগত ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। সেখান থেকেই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘ডা. এম’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। চিকিৎসক হিসেবে মানুষের জীবন ও সমাজকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতাই তাঁকে রাজনীতিতে আসতে অনুপ্রাণিত করে।

মাহাথিরের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে ইউনাইটেড মালয়াস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও)-এ যোগদানের মাধ্যমে। স্বাধীনতা-পরবর্তী মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে দলটি ছিল অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন। দলের হয়ে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন মাহাথির এবং ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মতো পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন।

আরও পড়ুন  আমির খানের বিয়ে নিয়ে বড় ঘোষণা: গৌরী স্প্র্যাটের সাথে নতুন ইনিংস

তবে তাঁর রাজনৈতিক পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। ১৯৬৯ সালে দলীয় অবস্থানের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে তাঁকে ইউএমএনও থেকে বহিষ্কার করা হয়। অনেকের ধারণা ছিল, এখানেই তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটি। ১৯৭২ সালে তিনি আবার দলে ফিরে আসেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

১৯৭৪ সালে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি মন্ত্রিসভায় স্থান পান। প্রথমে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৭৬ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী হন। অবশেষে ১৯৮১ সালে মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময় থেকেই শুরু হয় দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ ও প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রিত্বের অধ্যায়।

প্রথম দফায় টানা ২২ বছর, অর্থাৎ ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মাহাথির। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি মালয়েশিয়াকে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে, শিল্পায়ন গতি পায় এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতি গড়ে ওঠে।

মাহাথিরের আমলে মালয়েশিয়ায় একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। রাজধানী কুয়ালালামপুরে নির্মিত পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পুত্রাজায়া প্রশাসনিক নগরী এবং নর্থ-সাউথ এক্সপ্রেসওয়ে তাঁর উন্নয়ন দর্শনের প্রতীক হয়ে ওঠে। এসব প্রকল্প শুধু অবকাঠামো উন্নয়নেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মালয়েশিয়ার ভাবমূর্তি গড়তেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৯১ সালে তিনি ঘোষণা করেন বহুল আলোচিত ‘ভিশন ২০২০’। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়াকে একটি উন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করা। যদিও সব লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি, তবুও এই পরিকল্পনা মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।

আরও পড়ুন  ঢাকা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক জোরদারে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র

মাহাথিরের নেতৃত্বে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটে। দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার ঘটে, কর্মসংস্থান বাড়ে, দারিদ্র্যের হার কমে এবং মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এসব কারণেই তাঁকে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার বলা হয়।

তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুধু প্রশংসায় সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী মত দমন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, বিচার বিভাগের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের অভিযোগও ওঠে। বিশেষ করে ১৯৮৭ সালের ‘অপারেশন লালাং’ এবং ১৯৮৮ সালের বিচার বিভাগীয় সংকট তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

মাহাথিরের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল তাঁর সাবেক সহযোগী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। একসময় যাঁকে নিজের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হতো, সেই আনোয়ারকে ১৯৯৮ সালে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সমকামিতার অভিযোগ আনা হয়। আনোয়ার দাবি করেন, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা হয়।

২০০৩ সালে ২২ বছরের দীর্ঘ শাসনের পর মাহাথির স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন। অনেকেই মনে করেছিলেন, এবার হয়তো তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি অবসর নেবেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসন নিয়ে নিয়মিত মতামত দিতে থাকেন এবং জাতীয় ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

দীর্ঘ ১৫ বছর পর ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটে মাহাথিরের। তখন তাঁর বয়স ৯২ বছর। দুর্নীতির অভিযোগে বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে বিরোধী জোট গঠন করে নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবারও দায়িত্ব গ্রহণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন মাহাথির।

আরও পড়ুন  ইয়েমেনে ভয়াবহ হুতি হামলা, নিহত ১৪ সরকারি সেনা

তবে দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রিত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রাজনৈতিক জোটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ২০২০ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। এর মাধ্যমে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে। এরপরও তিনি রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরে যাননি এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে নিজের মতামত প্রকাশ করে যাচ্ছেন।

২০২২ সালের নির্বাচনে তিনি নিজের সংসদীয় আসন হারান, যা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় ধাক্কা। তবুও তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য দিচ্ছেন। বয়সের ভার তাঁকে থামাতে পারেনি।

বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়েও মাহাথির সক্রিয় জীবনযাপন করছেন। কয়েকবার হার্টের অস্ত্রোপচার, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং চলতি বছরে পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার পরও তিনি জনজীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। তাঁর মতে, “কাজই সবচেয়ে ভালো ওষুধ।”

১০১ বছরে পদার্পণ করেও মাহাথির মোহাম্মদ বিশ্ব রাজনীতির এক অনন্য অধ্যায়। কেউ তাঁকে উন্নয়নের স্থপতি বলেন, আবার কেউ তাঁর শাসনকে কর্তৃত্ববাদী হিসেবে মূল্যায়ন করেন। কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আধুনিক মালয়েশিয়ার অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা ও শিল্পায়নের ভিত্তি নির্মাণে তাঁর অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর নীতি, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের জন্য গবেষণা ও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।