চট্টগ্রামের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সাবেক শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী আলহাজ মো. নজরুল ইসলাম চৌধুরীর দ্বিতীয় জানাজায় হাজারো মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ১১টায় চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চনাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়ে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
জানাজার নামাজে ইমামতি করেন স্থানীয় একজন আলেম। নামাজ শেষে বিশেষ মোনাজাতে মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। সকাল থেকেই কাঞ্চনাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মানুষের সমাগম শুরু হয়। চন্দনাইশের পাশাপাশি সাতকানিয়া, পটিয়া, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম নগর এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ শেষবারের মতো প্রিয় নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে উপস্থিত হন।

এর আগে সোমবার (১৩ জুলাই) রাত ১০টায় চট্টগ্রাম নগরের বিভারলি হিল সোসাইটিতে তাঁর বাসভবনের সামনে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ নিজ জন্মস্থান চন্দনাইশে নেওয়া হয়, যেখানে দ্বিতীয় জানাজার আয়োজন করা হয়।
দ্বিতীয় জানাজা শেষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করা হয়। এ সময় গার্ড অব অনার দেওয়া হয় এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়নের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। দাফনের সময় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত হয়ে নজরুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান এবং এলাকার উন্নয়নে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। বক্তারা বলেন, তিনি ছিলেন একজন সজ্জন, বিনয়ী ও জনবান্ধব রাজনীতিক। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত আচরণ ও মানবিক গুণাবলীর কারণে তিনি সকলের কাছে সম্মানিত ছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দারাও জানান, নজরুল ইসলাম চৌধুরী সব সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। এলাকার উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক যোগাযোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান আজও মানুষ স্মরণ করে। তাঁর মৃত্যুতে চন্দনাইশসহ পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নজরুল ইসলাম চৌধুরী সোমবার (১৩ জুলাই) ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গন, মুক্তিযোদ্ধা সমাজ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়।
তিনি চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার একাংশ) আসন থেকে তিনবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং উন্নয়নমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করেন।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবদান দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগের জন্য তিনি ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন।
জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার পরও কাঞ্চনাবাদে মানুষের ভিড় কমেনি। অনেকে কবর জিয়ারত করেন এবং তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, নজরুল ইসলাম চৌধুরীর মৃত্যুতে চন্দনাইশ একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও অভিভাবককে হারিয়েছে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।



























