মালাক্কা করিডর: কেন বিকল্প পথ তৈরিতে মনোযোগী চীন?
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট মালাক্কা করিডর। চীনের আমদানি-রপ্তানির বড় একটি অংশ এবং বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস এই পথ দিয়েই দেশটিতে পৌঁছে। তাই মালাক্কা প্রণালিতে কোনো ধরনের সংকট তৈরি হলে চীনের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চাপের মুখে পড়তে পারে। এই ঝুঁকি কমাতেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিকল্প করিডর নির্মাণে জোর দিচ্ছে বেইজিং।
মালাক্কা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
মালাক্কা প্রণালি ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে। বিশ্বের ব্যস্ততম নৌপথগুলোর একটি এটি। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপ থেকে আসা বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পণ্য এই পথ ব্যবহার করে পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছায়।
চীনের জন্য এই রুটের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ দেশটির শিল্প উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহ অনেকটাই এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
কী এই ‘মালাক্কা ডিলেমা’?
২০০৩ সালে চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও প্রথম “মালাক্কা ডিলেমা” শব্দটি ব্যবহার করেন। এর অর্থ হলো, একটি মাত্র সমুদ্রপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা সামরিক সংঘাতের সময় এই পথ বাধাগ্রস্ত হলে চীনের জ্বালানি আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরিকে এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে দেখছে বেইজিং।
বিকল্প করিডর গড়ছে কেন?
চীন এখন শুধু একটি বিকল্প পথ নয়, বরং একাধিক করিডর তৈরি করতে চায়। এই কৌশলকে বিশেষজ্ঞরা ‘করিডর-হেজিং’ নামে অভিহিত করেন।
এর মূল লক্ষ্য হলো—কোনো একটি পথ বন্ধ হয়ে গেলে অন্য পথ ব্যবহার করে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা। এজন্য চীন সমুদ্রপথের পাশাপাশি রেলপথ, মহাসড়ক, পাইপলাইন এবং গভীর সমুদ্রবন্দরে বড় বিনিয়োগ করছে।
মিয়ানমার ও পাকিস্তান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের মাধ্যমে রাখাইনের কিয়াউকফিউ বন্দর থেকে তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউনান প্রদেশে জ্বালানি পৌঁছানো সম্ভব। এতে মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমে।
অন্যদিকে চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (CPEC) আওতায় গড়ে ওঠা গওয়াদর বন্দরও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এসব করিডর সমুদ্রপথের পুরো বিকল্প নয়, তবে সংকটের সময় এগুলো কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে
সম্প্রতি চীন চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করাই এই পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য।
চীনের আসল লক্ষ্য কী?
চীন জানে, আগামী কয়েক দশকেও সমুদ্রপথের বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই তাদের লক্ষ্য সমুদ্রপথ বাদ দেওয়া নয়, বরং প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্য একাধিক বিকল্প পথ তৈরি করা।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের কৌশল হবে এমন একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যেখানে কোনো একটি পথ বন্ধ হয়ে গেলেও অন্য পথ দিয়ে বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ চালিয়ে নেওয়া যাবে। এই কারণেই মালাক্কা করিডরকে ঘিরে চীনের পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক গুরুত্ব পাচ্ছে।




























