বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮ দল নিয়ে আয়োজিত আসরের সফল সমাপ্তির পর নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আরও বড় পরিকল্পনা। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ভবিষ্যতে বিশ্বকাপে ৬৪টি দল অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন। যদিও বিষয়টি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি, তবু ২০৩০ বিশ্বকাপকে ঘিরে এই প্রস্তাব ফুটবল বিশ্বে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমর্থকদের একাংশ এটিকে বিশ্ব ফুটবলের প্রসার হিসেবে দেখছেন, আবার সমালোচকদের মতে, এতে বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই আসরকে সার্বিকভাবে সফল বলেই মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সেই অভিজ্ঞতার পরই বিশ্বকাপের পরিধি আরও বাড়ানোর আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে। ইনফান্তিনোর যুক্তি, বেশি দেশের অংশগ্রহণ মানে বিশ্বজুড়ে ফুটবলের আরও বিস্তার এবং নতুন বাজার তৈরি হওয়া। একই সঙ্গে ম্যাচের সংখ্যা ও বাণিজ্যিক আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
ফিফা সভাপতির বক্তব্য, ছোট দেশগুলোকে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ না দিলে তাদের ফুটবলের উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে। তাঁর মতে, বিশ্বকাপ শুধু শীর্ষ দলগুলোর টুর্নামেন্ট নয়, বরং বৈশ্বিক ফুটবল উন্নয়নের অন্যতম বড় মঞ্চ। ৩২ দল থেকে ৪৮ দলে সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও তিনি একই ধরনের অবস্থান নিয়েছিলেন এবং সেই পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে।
তবে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব প্রথম আসে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনমেবল (CONMEBOL)-এর পক্ষ থেকে। ২০৩০ সালে বিশ্বকাপের শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজক দেশগুলোর মধ্যে আরও বেশি ম্যাচ বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে—এমন যুক্তি দেখিয়ে তারা এই প্রস্তাব দেয়। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা স্পেন, পর্তুগাল, মরক্কো, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ের যৌথ আয়োজনে।
যদিও কনমেবল এ পরিকল্পনার পক্ষে, ইউরোপসহ বেশ কয়েকটি ফুটবল ফেডারেশন এতে আপত্তি জানিয়েছে। অনেকের মতে, দল বাড়তে থাকলে বিশ্বকাপের মর্যাদা ও প্রতিযোগিতার মান কমে যেতে পারে। আবার অতিরিক্ত ম্যাচের কারণে খেলোয়াড়দের ওপর চাপ, ভ্রমণ এবং সূচি নিয়েও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। ফলে বিষয়টি নিয়ে এখনও ফিফার ভেতরেও ঐকমত্য তৈরি হয়নি।
৬৪ দলের ফরম্যাট চালু হলে বর্তমান ১২টি গ্রুপের পরিবর্তে ১৬টি গ্রুপ করা সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই দল সরাসরি শেষ ৩২-এ উঠবে। এতে সেরা তৃতীয় স্থানধারী দল বাছাইয়ের জটিলতা থাকবে না। অনেক বিশ্লেষকের মতে, প্রতিযোগিতার কাঠামো আরও সহজ ও স্বচ্ছ হবে।
দল বাড়ানোর পক্ষে আরেকটি যুক্তি হলো, বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে শক্তিশালী অনেক দল বাদ পড়ে যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট পায়নি ইতালি, ডেনমার্ক, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, সার্বিয়া, ওয়েলস ও পোল্যান্ডের মতো দল। অন্যদিকে কুরাসাও ও কেপ ভার্দের মতো নতুন দল নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। তাই আরও ১৬টি দল যোগ হলেও প্রতিযোগিতার মান পুরোপুরি নষ্ট হবে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
তবে বিপরীত চিত্রও রয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে এশিয়ার বেশ কয়েকটি দল প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। আফ্রিকার অধিকাংশ প্রতিনিধি নকআউট পর্বে উঠলেও এশিয়ার মাত্র দুটি দল জায়গা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়। ফলে অনেকেই মনে করছেন, শুধু দল বাড়ানো নয়, বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিযোগিতার মান উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত এককভাবে ফিফা সভাপতির হাতে নেই। ইনফান্তিনো প্রস্তাবটির পক্ষে থাকলেও এটি বাস্তবায়নের জন্য ফিফা কাউন্সিলের অনুমোদন এবং সদস্য দেশগুলোর সমর্থন প্রয়োজন। ইউরোপীয় ফুটবল মহলের আপত্তি এবং প্রশাসনিক সমীকরণও এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ এখনই বাস্তবতা নয়, তবে সম্ভাবনার আলোচনায় এটি গুরুত্ব পাচ্ছে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ সফল হওয়ায় ফিফা নতুন সম্প্রসারণ নিয়ে ভাবছে। শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে ফিফার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, সদস্য ফেডারেশনগুলোর মতামত এবং আগামী কয়েক বছরের প্রশাসনিক সমঝোতার ওপর।





























