ঢাকা ১১:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo হতাশা নয়, ছোট সুযোগেই গড়ুন ক্যারিয়ার: তরুণদের জন্য বার্তা Logo ওজন কমাতে দিনে কত কদম হাঁটা দরকার? জানুন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ Logo জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির নবগঠিত উপদেষ্টা ও কার্যকরী কমিটির পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত Logo মাদকাসক্তি সংকট: চট্টগ্রামে সোয়া লাখের বেশি আসক্ত, চিকিৎসা শয্যা বাড়ানোর জোরালো দাবি Logo যুক্তরাষ্ট্র হামলা থামালেও কেন আবার সংঘাতে জড়ালো ইরান? Logo ‘ফাঁসি দিয়ে দেন, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত’—কাঠগড়ায় লতিফ সিদ্দিকী Logo অস্ট্রেলিয়া সিরিজে বাংলাদেশের লক্ষ্য কী? জানালেন শান্ত Logo এশিয়ান গেমস হকি ক্যাম্পে জিমি, নতুন ৬ খেলোয়াড়ের ডাক Logo হারিকেলা রাজ্য: চট্টগ্রামের প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস Logo চট্টগ্রামের পুরোনো নাম: শেতগাং থেকে চট্টগ্রামের ইতিহাস

চট্টগ্রামের পুরোনো নাম: শেতগাং থেকে চট্টগ্রামের ইতিহাস

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৭:০৯:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
  • ৫১৭

প্রাচীন নাম ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে আজকের চট্টগ্রাম। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের পুরোনো নাম নিয়ে মানুষের আগ্রহ বহুদিনের। আজকের পরিচিত “চট্টগ্রাম” নামটি একদিনে তৈরি হয়নি। সময়ের পরিবর্তন, বিভিন্ন জাতির আগমন, ভাষার পরিবর্তন এবং ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের নামও পরিবর্তিত হয়েছে। সমুদ্র, পাহাড় ও নদীর মিলনে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম প্রাচীনকাল থেকেই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। বিশেষ করে বন্দর হিসেবে এর গুরুত্ব এতটাই বেশি ছিল যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের কাছে এই অঞ্চল পরিচিত হয়ে উঠেছিল নানা নামে।

চট্টগ্রামের নামের ইতিহাসের সঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি হলো শেতগাং। ধারণা করা হয়, প্রাচীন ইউরোপীয় নাবিক ও ভ্রমণকারীদের বিভিন্ন নথিতে চট্টগ্রামের নামের পরিবর্তিত রূপ হিসেবে “শেতগাং” বা কাছাকাছি উচ্চারণের নাম পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে স্থানীয় উচ্চারণ ও বিদেশি ভাষার প্রভাবে নামের রূপ পরিবর্তিত হয়েছে।

অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, চট্টগ্রামের নামের সঙ্গে “চাটিগাঁও” বা “চাটগাঁও” শব্দের সম্পর্ক রয়েছে। স্থানীয় ভাষার উচ্চারণ, আঞ্চলিক ব্যবহার এবং বিভিন্ন শাসনামলের নথিতে এই নামের ব্যবহার দেখা যায়।আরেকটি প্রাচীন নাম হলো চট্টলা। বাংলা সাহিত্যে ও ঐতিহাসিক লেখায় চট্টগ্রাম অঞ্চলকে অনেক সময় চট্টলা নামে উল্লেখ করা হয়েছে। “চট্টলা” নামটি এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এর বন্দর। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলের সঙ্গে আরব, পারস্য, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। বিদেশি ব্যবসায়ীরা নিজেদের ভাষা অনুযায়ী এই এলাকার নাম উচ্চারণ করতেন।সমুদ্রপথে আসা ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের লেখায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন নাম পাওয়া যায়। গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমির সময়েও বঙ্গ অঞ্চলের বন্দরগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও চট্টগ্রামের নামের নির্দিষ্ট রূপ নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তবে এই অঞ্চল যে প্রাচীন বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বড় কোনো দ্বিমত নেই।

মধ্যযুগে চট্টগ্রাম কখনো স্বাধীন রাজ্য, কখনো সুলতানি ও মুঘল শাসনের অংশ ছিল। প্রতিটি সময়ের প্রশাসনিক ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব এই অঞ্চলের নামের ওপর পড়েছে।মুঘল আমলে চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল। এই সময় শহরের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি বানান ও উচ্চারণের মাধ্যমে “Chittagong” নামটি আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ব্রিটিশ শাসনের সময় চট্টগ্রাম রেলপথ, বন্দর ও বাণিজ্যের কারণে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়। তখন সরকারি নথি, মানচিত্র ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে Chittagong নামটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।স্বাধীন বাংলাদেশের পরও দীর্ঘদিন “চট্টগ্রাম” নামটি প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে সরকারি ইংরেজি বানানে “Chittagong” পরিবর্তন করে “Chattogram” করা হয়, যা বাংলা উচ্চারণের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ।একটি শহরের নাম শুধু একটি শব্দ নয়, এটি সেই শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের পরিচয়ের অংশ। চট্টগ্রামের পুরোনো নামগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই অঞ্চল কত শত বছর ধরে বিভিন্ন সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

চট্টগ্রামের নামের ইতিহাস আসলে একটি বন্দর নগরীর বিবর্তনের গল্প। যেখানে এসেছে ব্যবসায়ী, নাবিক, পর্যটক ও বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ। তাদের যোগাযোগ, ভাষা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে আজকের চট্টগ্রামের পরিচয়।আজকের আধুনিক চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বড় অংশ এই শহরকে ঘিরে পরিচালিত হয়। কিন্তু আধুনিকতার আড়ালে রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো এক ইতিহাস।

শেতগাং, চাটিগাঁও, চট্টলা থেকে চট্টগ্রাম, এই নামের যাত্রা শুধু একটি শব্দের পরিবর্তন নয়, এটি একটি সভ্যতার পরিবর্তনের গল্প। পাহাড়, নদী ও সমুদ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই শহর তার ইতিহাসের জন্য আজও অনন্য।চট্টগ্রামের পুরোনো নাম নিয়ে গবেষণা করলে দেখা যায়, প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আলাদা একটি সময়, আলাদা একটি সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার গল্প। আর এই ইতিহাসই চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শহরে পরিণত করেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হতাশা নয়, ছোট সুযোগেই গড়ুন ক্যারিয়ার: তরুণদের জন্য বার্তা

চট্টগ্রামের পুরোনো নাম: শেতগাং থেকে চট্টগ্রামের ইতিহাস

Update Time : ০৭:০৯:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামের পুরোনো নাম নিয়ে মানুষের আগ্রহ বহুদিনের। আজকের পরিচিত “চট্টগ্রাম” নামটি একদিনে তৈরি হয়নি। সময়ের পরিবর্তন, বিভিন্ন জাতির আগমন, ভাষার পরিবর্তন এবং ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের নামও পরিবর্তিত হয়েছে। সমুদ্র, পাহাড় ও নদীর মিলনে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম প্রাচীনকাল থেকেই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। বিশেষ করে বন্দর হিসেবে এর গুরুত্ব এতটাই বেশি ছিল যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের কাছে এই অঞ্চল পরিচিত হয়ে উঠেছিল নানা নামে।

চট্টগ্রামের নামের ইতিহাসের সঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি হলো শেতগাং। ধারণা করা হয়, প্রাচীন ইউরোপীয় নাবিক ও ভ্রমণকারীদের বিভিন্ন নথিতে চট্টগ্রামের নামের পরিবর্তিত রূপ হিসেবে “শেতগাং” বা কাছাকাছি উচ্চারণের নাম পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে স্থানীয় উচ্চারণ ও বিদেশি ভাষার প্রভাবে নামের রূপ পরিবর্তিত হয়েছে।

অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, চট্টগ্রামের নামের সঙ্গে “চাটিগাঁও” বা “চাটগাঁও” শব্দের সম্পর্ক রয়েছে। স্থানীয় ভাষার উচ্চারণ, আঞ্চলিক ব্যবহার এবং বিভিন্ন শাসনামলের নথিতে এই নামের ব্যবহার দেখা যায়।আরেকটি প্রাচীন নাম হলো চট্টলা। বাংলা সাহিত্যে ও ঐতিহাসিক লেখায় চট্টগ্রাম অঞ্চলকে অনেক সময় চট্টলা নামে উল্লেখ করা হয়েছে। “চট্টলা” নামটি এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রাম পরিচ্ছন্নতা অভিযান: মেয়রের বড় বার্তা নাগরিকদের

চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এর বন্দর। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলের সঙ্গে আরব, পারস্য, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। বিদেশি ব্যবসায়ীরা নিজেদের ভাষা অনুযায়ী এই এলাকার নাম উচ্চারণ করতেন।সমুদ্রপথে আসা ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের লেখায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন নাম পাওয়া যায়। গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমির সময়েও বঙ্গ অঞ্চলের বন্দরগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও চট্টগ্রামের নামের নির্দিষ্ট রূপ নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তবে এই অঞ্চল যে প্রাচীন বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বড় কোনো দ্বিমত নেই।

মধ্যযুগে চট্টগ্রাম কখনো স্বাধীন রাজ্য, কখনো সুলতানি ও মুঘল শাসনের অংশ ছিল। প্রতিটি সময়ের প্রশাসনিক ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব এই অঞ্চলের নামের ওপর পড়েছে।মুঘল আমলে চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল। এই সময় শহরের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি বানান ও উচ্চারণের মাধ্যমে “Chittagong” নামটি আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন  টলেমির মানচিত্রে চট্টগ্রাম: প্রাচীন বন্দর নগরীর ইতিহাস

ব্রিটিশ শাসনের সময় চট্টগ্রাম রেলপথ, বন্দর ও বাণিজ্যের কারণে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়। তখন সরকারি নথি, মানচিত্র ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে Chittagong নামটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।স্বাধীন বাংলাদেশের পরও দীর্ঘদিন “চট্টগ্রাম” নামটি প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে সরকারি ইংরেজি বানানে “Chittagong” পরিবর্তন করে “Chattogram” করা হয়, যা বাংলা উচ্চারণের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ।একটি শহরের নাম শুধু একটি শব্দ নয়, এটি সেই শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের পরিচয়ের অংশ। চট্টগ্রামের পুরোনো নামগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই অঞ্চল কত শত বছর ধরে বিভিন্ন সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

আরও পড়ুন  চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার খবর বানোয়াট: প্রতিমন্ত্রীর দাবি

চট্টগ্রামের নামের ইতিহাস আসলে একটি বন্দর নগরীর বিবর্তনের গল্প। যেখানে এসেছে ব্যবসায়ী, নাবিক, পর্যটক ও বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ। তাদের যোগাযোগ, ভাষা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে আজকের চট্টগ্রামের পরিচয়।আজকের আধুনিক চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বড় অংশ এই শহরকে ঘিরে পরিচালিত হয়। কিন্তু আধুনিকতার আড়ালে রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো এক ইতিহাস।

শেতগাং, চাটিগাঁও, চট্টলা থেকে চট্টগ্রাম, এই নামের যাত্রা শুধু একটি শব্দের পরিবর্তন নয়, এটি একটি সভ্যতার পরিবর্তনের গল্প। পাহাড়, নদী ও সমুদ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই শহর তার ইতিহাসের জন্য আজও অনন্য।চট্টগ্রামের পুরোনো নাম নিয়ে গবেষণা করলে দেখা যায়, প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আলাদা একটি সময়, আলাদা একটি সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার গল্প। আর এই ইতিহাসই চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শহরে পরিণত করেছে।