পোশাক রপ্তানিতে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই কিছুটা চাপ দেখা দিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক থেকে রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার।
পোশাক রপ্তানির এই কমতির পেছনে নিটওয়্যার ও ওভেন—দুই উপখাতেরই ভূমিকা রয়েছে। তবে দুই খাতের মধ্যে ওভেন পোশাকের রপ্তানি কমেছে তুলনামূলক বেশি। জুলাইয়ে নিটওয়্যার রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ওভেন পোশাকের রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ।

ইপিবির হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মোট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের মতো। গত বছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯৬ কোটি ২৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। তবে আগের মাস জুনের তুলনায় জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
খাতভিত্তিক হিসাবে নিটওয়্যার থেকে জুলাইয়ে এসেছে প্রায় ২১৫ কোটি ৯১ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ২১৭ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। অন্যদিকে ওভেন পোশাক থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১৭২ কোটি ৭৭ লাখ ডলার, যা আগের বছরের ১৭৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের তুলনায় কম। ফলে সামগ্রিক পোশাক রপ্তানির ওপর ওভেন খাতের দুর্বলতার প্রভাব বেশি পড়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা, ক্রেতাদের সতর্ক অবস্থান, উৎপাদন ব্যয় এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা পোশাক রপ্তানিতে চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে বড় বাজারগুলোর ক্রেতারা অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি হিসাব করে এগোচ্ছেন। বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তনও বাংলাদেশের পোশাক ব্যবসায় প্রভাব ফেলছে।
এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে। পোশাক কারখানাগুলোতেও জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহারে চাপ তৈরি করছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
তবে জুলাইয়ের পরিসংখ্যানকে পুরো বছরের চূড়ান্ত চিত্র হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। কারণ নতুন অর্থবছরের প্রথম মাসেই কিছুটা পতন হলেও মাসভিত্তিক হিসাবে রপ্তানি বেড়েছে। এর অর্থ হলো বাজারে চাহিদা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। বরং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে সামনে রপ্তানি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বড় বাজারগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৯১৮ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে জার্মানি ও যুক্তরাজ্যেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পোশাক রপ্তানি হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য নতুন বাজার খোঁজা এবং বিদ্যমান বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। শুধু কম দামের পোশাকের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের ও বেশি মূল্য সংযোজিত পোশাকের উৎপাদন বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশা, বছরের পরবর্তী সময়ে বড়দিন ও বসন্ত মৌসুমকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে উৎপাদন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা গেলে পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ফেরার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এজন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয় এবং ব্যবসার সামগ্রিক পরিবেশে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের গুরুত্ব অনেক বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও তৈরি পোশাক থেকে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে। তাই নতুন অর্থবছরের শুরুতে পোশাক রপ্তানিতে এই সামান্য পতন নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের জন্য নজর দেওয়ার মতো বিষয় হলেও এখনই বড় ধরনের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সামনের মাসগুলোতে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার, বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা এবং দেশের উৎপাদন সক্ষমতা—এই তিনটি বিষয়ই পোশাক রপ্তানির গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। নতুন বাজারে প্রবেশ, পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আবারও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারে।





























