মুঘল আমলে চট্টগ্রাম শুধু একটি জনপদের নাম ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর একটি। আজকের ব্যস্ত বাণিজ্যিক নগরী হওয়ার পেছনে মুঘল শাসনামলের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়ের প্রশাসনিক পরিবর্তন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বাণিজ্যের প্রসার এবং নতুন নগর পরিকল্পনা চট্টগ্রামের পরিচয়কে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
১৭শ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকান রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই অঞ্চলে জলদস্যুদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত। সমুদ্রপথে ব্যবসা করতে আসা জাহাজগুলো প্রায়ই লুটপাটের শিকার হতো। ফলে চট্টগ্রামের সম্ভাবনা থাকলেও নিরাপত্তার অভাবে বন্দরটি পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারেনি। ১৬৬৬ সালে মুঘল সেনাপতি শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে চট্টগ্রাম মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই বিজয়ের মাধ্যমে শুধু একটি ভূখণ্ড দখল হয়নি, বরং বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর নতুনভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ পায়।
মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠার পর জলদস্যু দমন করা হয়। সমুদ্রপথ নিরাপদ হয়ে ওঠায় দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীরা আবার চট্টগ্রামে আসতে শুরু করেন। কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নতুন বাণিজ্যিক কার্যক্রম। ধীরে ধীরে এই অঞ্চল বাংলার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। মুঘল আমলে চট্টগ্রাম প্রশাসনিকভাবেও নতুন পরিচয় পায়। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মুঘলরা শহরের নাম পরিবর্তন করে ইসলামাবাদ রাখে। যদিও সাধারণ মানুষের মুখে চট্টগ্রাম নামটিই বেশি প্রচলিত ছিল এবং পরবর্তীতে সেটিই স্থায়ী হয়ে যায়।
মুঘল প্রশাসন শুধু সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি, বরং রাজস্ব আদায়, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্ব দেয়। ফলে কৃষি, ব্যবসা ও জনবসতি দ্রুত বাড়তে থাকে।কর্ণফুলী নদীর তীরে নতুন বাজার গড়ে ওঠে। দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা চাল, তুলা, লবণ, মসলাসহ নানা ধরনের পণ্য নিয়ে আসতেন। এখান থেকে এসব পণ্য বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হতো। চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থানও মুঘলদের জন্য বড় সুবিধা ছিল। বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকায় এটি সামরিক ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই সময়ে আরব, পারস্য, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। মুঘল আমলে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও দেখা যায়। নতুন মসজিদ, প্রশাসনিক ভবন এবং জনবসতি গড়ে ওঠে। এসব স্থাপনার কিছু নিদর্শন আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নিরাপদ বন্দর হওয়ার ফলে বিদেশি নাবিকদের কাছেও চট্টগ্রামের পরিচিতি বাড়ে। ইউরোপীয় বণিকরাও এই অঞ্চলের প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসনামলেও এই বন্দর তার গুরুত্ব ধরে রাখে।আজকের আধুনিক চট্টগ্রাম বন্দরের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই। মুঘল শাসনামলের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ খুলে দেয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, যদি মুঘলরা জলদস্যু দমন করে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতেন, তাহলে চট্টগ্রাম হয়তো এত দ্রুত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারত না। বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের যে অবদান, তার শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় সেই মুঘল আমলেই। কারণ তখনই এই অঞ্চলের বন্দর ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নতুন মাত্রা পায়।
মুঘল আমলে চট্টগ্রাম শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়। এটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক ঐতিহ্য, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সেই কারণেই আজও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে মুঘল যুগের চট্টগ্রাম একটি গবেষণার আকর্ষণীয় বিষয়।
























