হারানো ইনকা নগরী নিয়ে ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর রহস্যের শুরু প্রায় এক শতাব্দী আগে। ১৯১১ সালে মার্কিন গবেষক হিরাম বিংহাম মাচু পিচুকে আবিষ্কারের পর মনে করেছিলেন, তিনিই ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ আশ্রয়স্থল ভিলকাবাম্বা খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু পরে জানা যায়, তার ধারণা পুরোপুরি সঠিক ছিল না। প্রায় ৫০ বছর পর আরেক মার্কিন অভিযাত্রী জিন স্যাভয় পেরুর দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলে গিয়ে এমন কিছু ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান, যা হারানো শহরটির পরিচয় নতুন করে সামনে আনে।
ভিলকাবাম্বা ছিল ইনকা শাসকদের শেষ গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। ১৫৩৬ সালে স্প্যানিশ বিজেতারা কুসকো দখল করার পর ইনকা রাজা মানকো তার অনুসারীদের নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে চলে যান। সেখানে গড়ে ওঠে নতুন রাজধানী। কয়েক দশক ধরে এই নগরী থেকেই স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত ১৫৭২ সালে স্প্যানিশ বাহিনীর আক্রমণের মুখে ইনকারা শহরটি পুড়িয়ে পালিয়ে যায়। এরপর ঘন জঙ্গল ধীরে ধীরে পুরো নগরীকে আড়াল করে ফেলে এবং এর অবস্থান বহু বছর ধরে রহস্য হয়ে থাকে।
হারানো ইনকা নগরীর সন্ধানে বিংহামের অভিযানও ছিল বেশ নাটকীয়। তিনি মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক ছিলেন না; লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের একজন অধ্যাপক হিসেবে পেরু ভ্রমণ করছিলেন। স্থানীয়দের কাছ থেকে হারানো ইনকা রাজধানীর গল্প শুনে তিনি অনুসন্ধানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯১১ সালের অভিযানে তিনি দুর্গম এলাকায় পৌঁছালেও আবহাওয়া, খাবারের সংকট ও যাত্রার নানা সমস্যার কারণে অনেক জায়গা দ্রুত পেরিয়ে যান। পরে মাচু পিচুকেই তিনি ভিলকাবাম্বা হিসেবে দাবি করেন। তবে তার এই ধারণা পরবর্তী গবেষণায় প্রশ্নের মুখে পড়ে।
১৯৬৪ সালে অভিযাত্রী জিন স্যাভয় ও পেরুভিয়ান অনুসন্ধানকারী আন্তোনিও সান্তান্ডার স্পিরিতু পাম্পা এলাকায় পৌঁছান। স্থানীয়দের ভয় ও নানা কিংবদন্তির কারণে তাদের পথ দেখাতে প্রথমে অনেকেই রাজি ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তারা যখন জঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল পাথরের স্থাপনা, প্রাচীন ভবন, ফোয়ারা ও বিস্তৃত ধ্বংসাবশেষ। স্যাভয়ের কাছে এটি ছিল অবিশ্বাস্য দৃশ্য। পরে তার অনুসন্ধান ও নথিপত্র ভিলকাবাম্বার অবস্থান নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই অভিযানের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর একটি বিবিসি দলও একই দুর্গম পথে যায়। তাদের যাত্রাপথ ছিল ভয়ংকর—নদীর স্রোত, খাড়া পাহাড়, কাদা, ঘন জঙ্গল এবং লতাগুল্ম পেরিয়ে তাদের এগোতে হয়। সেখানে শত শত বছর ধরে প্রকৃতি প্রাচীন স্থাপনাগুলোকে প্রায় পুরোপুরি ঢেকে রেখেছিল। গবেষণার সময় পাওয়া ছাদের পোড়ামাটির টাইল বিশেষ গুরুত্ব পায়। ইনকারা সাধারণত ছাদে খড় ব্যবহার করলেও ভিলকাবাম্বা সম্পর্কে পুরনো বর্ণনায় টাইল দিয়ে তৈরি ছাদের উল্লেখ ছিল। পরে ঐতিহাসিক জন হেমিংসহ গবেষকেরা ঐতিহাসিক বিবরণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য মিলিয়ে স্পিরিতু পাম্পাকে প্রাচীন ভিলকাবাম্বার সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে শক্ত প্রমাণ পান।
আজও হারানো ইনকা নগরী নিয়ে মানুষের কৌতূহল শেষ হয়নি। জঙ্গলে ঢাকা ভিলকাবাম্বার অনেক অংশ এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। প্রাচীন ইনকারা তাদের মূল্যবান সম্পদ কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল, সেটিও রহস্য। জিন স্যাভয় নিজেও ধারণা করেছিলেন, স্প্যানিশদের হাত থেকে বাঁচাতে ইনকারা সোনা-রত্ন হ্রদ, গুহা কিংবা গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো বিশাল গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। গবেষকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ধ্বংসাবশেষ ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায়, তাদের প্রতিরোধ এবং স্প্যানিশ বিজয়ের ইতিহাস বোঝার এক অসাধারণ জানালা খুলে দিয়েছে।


























