চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শাওমির স্মার্টফোন ব্যবসায় যন্ত্রাংশের বাড়তি দামের কারণে মুনাফায় চাপ তৈরি হলেও বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অন্যান্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবসা থেকে আয় বাড়ছে। ফলে স্মার্টফোননির্ভর ব্যবসা থেকে ধীরে ধীরে আরও বৈচিত্র্যময় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার কৌশল নিয়েছে শাওমি।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে শাওমি জানিয়েছে, এ সময়ে কোম্পানির সমন্বিত নিট মুনাফা ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউয়ানে নেমেছে। বিশ্লেষকদের গড় পূর্বাভাস ছিল ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউয়ান। একই সময়ে কোম্পানির মোট আয় ৬ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১০৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউয়ানে দাঁড়িয়েছে।
শাওমির আয়ের বড় অংশ এখনো স্মার্টফোন ব্যবসা থেকে আসে। কিন্তু মেমোরি চিপসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই খাতের লাভ কমেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে স্মার্টফোন ব্যবসা থেকে কোম্পানির আয় হয়েছে ৪২ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউয়ান, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কম।
শুধু আয় কমেনি, স্মার্টফোন ব্যবসার মোট মুনাফার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এক বছর আগে যেখানে এই হার ছিল ১১ দশমিক ৫ শতাংশ, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।
অর্থাৎ স্মার্টফোন বিক্রি করলেও আগের তুলনায় প্রতিটি ডিভাইস থেকে শাওমির লাভের পরিমাণ কমেছে। যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি, বিশেষ করে মেমোরি চিপের বাড়তি খরচ, এর অন্যতম কারণ।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে শাওমি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ কোটি ১২ লাখ স্মার্টফোন সরবরাহ করেছে। এতে বোঝা যায়, বাজারে শাওমির উপস্থিতি শক্তিশালী থাকলেও স্মার্টফোন বিক্রির সঙ্গে লাভের ব্যবধান কমে যাচ্ছে।
শাওমির প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লু জানিয়েছেন, মেমোরি চিপের দাম এখনো তুলনামূলক বেশি। তবে দাম বৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। কোম্পানির প্রত্যাশা, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে যন্ত্রাংশের মূল্যজনিত চাপ আরও কিছুটা কমতে পারে।
এতে স্মার্টফোন ব্যবসার মুনাফা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাজারের প্রতিযোগিতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের ওপর পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
স্মার্টফোন ব্যবসায় চাপ থাকলেও শাওমির বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবসায় বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইভি ব্যবসা থেকে কোম্পানির আয় হয়েছে ২৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউয়ান। এক বছর আগের তুলনায় এই আয় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে শাওমি ১ লাখ ৪ হাজার ১৯৯টি বৈদ্যুতিক গাড়ি সরবরাহ করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গাড়ি সরবরাহ বেড়েছে ২৮ দশমিক ২ শতাংশ।
এই প্রবৃদ্ধি শাওমির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কয়েক বছর আগেও কোম্পানির প্রধান পরিচয় ছিল স্মার্টফোন ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকস নির্মাতা হিসেবে। এখন গাড়ি শিল্পে প্রবেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নতুন একটি বড় ব্যবসার ভিত্তি তৈরি করছে।
ইভি, এআই এবং অন্যান্য নতুন ব্যবসা মিলিয়ে দ্বিতীয় প্রান্তিকে শাওমির মোট আয়ের প্রায় ২৩ শতাংশ এসেছে। এক বছর আগে এই খাতগুলোর অবদান ছিল ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির মোট আয়ে নতুন ব্যবসাগুলোর গুরুত্ব বেড়েছে। স্মার্টফোন ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যাওয়ার সময় এই নতুন খাতগুলো শাওমির জন্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করছে।
বিশেষ করে ইভি ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণ কোম্পানির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠছে। গাড়ির পাশাপাশি এআই প্রযুক্তি এবং স্মার্ট ডিভাইসের সঙ্গে গাড়ি ও সফটওয়্যারকে যুক্ত করার সুযোগও শাওমির ব্যবসায়িক কৌশলকে আরও বিস্তৃত করছে।
শাওমির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্বও বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটি স্মার্টফোন, গাড়ি, স্মার্ট হোম ডিভাইসসহ বিভিন্ন পণ্যে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাইছে।
শাওমির তৈরি ডিভাইসগুলোকে একটি সমন্বিত প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। ফলে একজন ব্যবহারকারী একই প্রতিষ্ঠানের স্মার্টফোন, গাড়ি, স্মার্ট হোম পণ্য এবং অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহার করলে সেগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।
এই কৌশল সফল হলে শুধু একটি পণ্য বিক্রির পরিবর্তে ব্যবহারকারীর কাছ থেকে বিভিন্ন খাতের মাধ্যমে আয় করার সুযোগ বাড়বে।
শাওমির বর্তমান আর্থিক ফলাফল প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে। স্মার্টফোন এখনো কোম্পানির প্রধান ব্যবসাগুলোর একটি হলেও এই খাতে প্রবৃদ্ধির সুযোগ আগের তুলনায় সীমিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ইভি ও অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবসায় দ্রুত বিনিয়োগের মাধ্যমে শাওমি নতুন প্রবৃদ্ধির জায়গা তৈরি করছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে স্মার্টফোন ব্যবসার আয় কমলেও ইভি ব্যবসার আয় ও গাড়ি সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, শাওমির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নতুন ব্যবসায় দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি লাভজনকতা ধরে রাখা। ইভি খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে বড় মূলধনের প্রয়োজন হয়। একইভাবে এআই প্রযুক্তি উন্নয়নেও গবেষণা ও অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
তবু শাওমির সাম্প্রতিক ফলাফল দেখাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি শুধু স্মার্টফোন নির্মাতা হিসেবে থাকতে চাইছে না। ইভি, এআই এবং স্মার্ট প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর প্রযুক্তি ব্যবসা গড়ে তোলাই এখন শাওমির ভবিষ্যৎ কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য।




























