মস্তিষ্ক কীভাবে একই সময়ে এত ধরনের চিন্তা, স্মৃতি ও সিদ্ধান্তের কাজ সামলায়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। এবার নতুন এক গবেষণায় মস্তিষ্কের নিউরন সার্কিট নিয়ে পাওয়া গেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। গবেষকরা দেখেছেন, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু নিউরন গুচ্ছ প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন ধরনের তথ্য ধরে রাখার কাজে নিজেদের ভূমিকা বদলে নিতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের MIT-এর নিউরোসায়েন্টিস্টরা ইঁদুরের ওপর গবেষণা চালিয়ে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে এমন নিউরন গুচ্ছ শনাক্ত করেছেন, যা এক সময়ে কোনো সংবেদনশীল তথ্য এবং অন্য সময়ে একটি কাজের পরিকল্পনা ওয়ার্কিং মেমোরিতে ধরে রাখতে পারে।
সহজভাবে বললে, মস্তিষ্ক প্রতিটি নতুন কাজের জন্য আলাদা নিউরন সার্কিট তৈরি করে না। বরং একই সার্কিটকে প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারে। গবেষকদের মতে, এই ব্যবস্থা মস্তিষ্ককে সীমিত সংখ্যক নিউরন দিয়েই অসংখ্য ধরনের মানসিক কাজ সম্পাদনের সুযোগ দেয়।
কীভাবে কাজ করে এই ব্যবস্থা
গবেষণায় ইঁদুরকে এমন একটি কাজ শেখানো হয়, যেখানে তাদের দুটি শব্দের উচ্চতা বা পিচ একই কি না তা বুঝতে হতো। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হতো।
গবেষকরা ইঁদুরের মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক কার্যক্রম রেকর্ড করেন। বিশেষ নজর দেওয়া হয় প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ও প্যারাইটাল কর্টেক্সে। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অন্যান্য নির্বাহী কাজের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে প্যারাইটাল কর্টেক্স সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও নড়াচড়ার পরিকল্পনায় ভূমিকা রাখে।
প্রথম শব্দ শোনার পর দ্বিতীয় শব্দ শোনার আগ পর্যন্ত ইঁদুরকে প্রথম শব্দটির স্মৃতি ধরে রাখতে হতো। এরপর দ্বিতীয় শব্দ শোনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পর্যন্ত তাদের মনে রাখতে হতো কী কাজ করতে হবে।
এই দুই পর্যায়ে নিউরনের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখতে পান।
একই সার্কিটের ভিন্ন ব্যবহার
প্যারাইটাল কর্টেক্সে থাকা কিছু নিউরন মূলত শব্দের স্মৃতি ধরে রাখার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে গবেষকরা এমন একটি নিউরন গুচ্ছ খুঁজে পান, যা দুই ধরনের তথ্যই ধরে রাখতে সক্ষম।
প্রথম পর্যায়ে এই নিউরনগুলো প্রথম শব্দের স্মৃতি ধরে রাখছিল। পরে কাজের ধরন বদলে গেলে একই নিউরন গুচ্ছ ইঁদুরের পরবর্তী সিদ্ধান্ত বা কাজের পরিকল্পনা মনে রাখার দায়িত্ব নেয়।
অর্থাৎ মস্তিষ্কের নিউরন সার্কিট একটি নির্দিষ্ট কাজের মধ্যে আটকে থাকে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী একই সার্কিটকে নতুন তথ্য সংরক্ষণে ব্যবহার করা যায়।
MIT-এর গবেষকদের মতে, এই নমনীয়তাই মানুষের মতো জটিল মস্তিষ্ককে একই সঙ্গে অসংখ্য ধরনের আচরণ ও চিন্তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে।
মস্তিষ্ক যেন কগনিটিভ লেগোর মতো
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের এই ব্যবস্থাকে অনেকটা Lego-এর মতো তুলনা করেছেন। যেমন বিভিন্ন Lego ব্লক জোড়া দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন কাঠামো তৈরি করা যায়, তেমনি মস্তিষ্কও কিছু মৌলিক নিউরন সার্কিটকে ভিন্নভাবে সাজিয়ে নতুন ধরনের আচরণ তৈরি করতে পারে।
এর আগে একই গবেষক দলের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, কোনো প্রাণীকে আকৃতি বা রঙের মতো বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বস্তু শ্রেণিবদ্ধ করতে হলে মস্তিষ্ক বিভিন্ন কাজের জন্য আলাদা নিউরন সার্কিট একত্র করে।
নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। এবার দেখা গেল, একই নিউরন গুচ্ছই প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন ধরনের তথ্য ধরে রাখার দায়িত্ব নিতে পারে।
সীমিত নিউরন দিয়েই এত কাজ কীভাবে
মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য তথ্য সাময়িকভাবে মনে রাখে। বাজারে গিয়ে কেনাকাটার তালিকা মনে রাখা, দোকানের কর্মীর বলা কোনো তথ্য মনে রাখা কিংবা টাকা গুনে দেওয়ার মতো কাজ একই সময়ের মধ্যে করতে হয়।
মস্তিষ্কে নিউরনের সংখ্যা বিপুল হলেও প্রতিটি সম্ভাব্য কাজের জন্য আলাদা আলাদা সার্কিট থাকা বাস্তবসম্মত নয়। গবেষকদের মতে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য নিউরন সার্কিট এই সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক Yuma Osako-এর মতে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অগণিত ধরনের তথ্য সাময়িকভাবে ধরে রাখতে হয়। সীমিত সংখ্যক নিউরন কীভাবে এত বৈচিত্র্যময় তথ্য উপস্থাপন করতে পারে, সেটিই ছিল গবেষণার অন্যতম বড় প্রশ্ন।
স্মৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব
এই আবিষ্কার শুধু মস্তিষ্ক কীভাবে তথ্য সংরক্ষণ করে তা বোঝার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি মানুষের cognitive flexibility বা পরিস্থিতি অনুযায়ী চিন্তার ধরন বদলে নেওয়ার ক্ষমতা বোঝার ক্ষেত্রেও নতুন ধারণা দিতে পারে।
গবেষকদের মতে, নতুন কোনো কাজ শেখার সময় মস্তিষ্ককে প্রতিবার সম্পূর্ণ নতুন সার্কিট তৈরি করতে হয় না। আগে থেকে থাকা কার্যকর সার্কিটকে নতুন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেই নতুন দক্ষতা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এই প্রক্রিয়া মানুষের মস্তিষ্কে ঠিক একইভাবে কাজ করে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। বর্তমান গবেষণাটি ইঁদুরের ওপর পরিচালিত হয়েছে।
গবেষণার পরবর্তী ধাপ
গবেষকরা এখন জানতে চান, শনাক্ত করা নিউরন গুচ্ছগুলোর কার্যক্রম ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করলে ইঁদুরের আচরণে কী ধরনের পরিবর্তন হয়। এমন পরীক্ষা করলে এই নমনীয় নিউরন সার্কিটগুলো সত্যিই বিভিন্ন মানসিক কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে আরও শক্ত প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Nature Neuroscience জার্নালে। অর্থাৎ মস্তিষ্কের প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা নিউরন নির্ধারিত—এমন সরল ধারণার বদলে গবেষণাটি সামনে আনছে আরও নমনীয় একটি ছবি।
সব মিলিয়ে, নতুন গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মস্তিষ্ক অনেকটা দক্ষ একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য সিস্টেমের মতো কাজ করে। একই নিউরন সার্কিট প্রয়োজন অনুযায়ী স্মৃতি, সংবেদনশীল তথ্য কিংবা কাজের পরিকল্পনা ধরে রাখতে পারে। এই নমনীয়তাই হয়তো আমাদের মস্তিষ্ককে প্রতিদিনের অসংখ্য নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দেয়।





























