মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্য দিনটি ছিল আবেগে ভরা। বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বিদায়ী বক্তব্য দিতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন দলের সদ্য সাবেক মহাসচিব। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার সহকর্মীদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দায়িত্ব পালনের সময় কোনো ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা চান তিনি। একই সঙ্গে দলীয় সংসদ সদস্যদের কাছে দোয়া চান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর কান্নাজড়িত বক্তব্যে সভাকক্ষেও তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
মির্জা ফখরুলের বিদায়ী বক্তব্যের শুরুতেই উঠে আসে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা স্মৃতি। বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। একই সঙ্গে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিএনপিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনের সময়ে অজান্তে কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
মির্জা ফখরুল বলেন, দল তাঁকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, তিনি জীবন দিয়ে হলেও সেই সম্মান রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না বলেও দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে বঙ্গভবনে গেলে দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের মিস করবেন উল্লেখ করে সবার কাছে দোয়া চান। বক্তব্যের কয়েক মিনিটের মধ্যেই চার থেকে পাঁচবার কেঁদে ফেলেন তিনি। তাঁর আবেগঘন বক্তব্যে উপস্থিত সংসদ সদস্যদের মধ্যেও নীরবতা নেমে আসে।
সভায় মির্জা ফখরুলের আগে বক্তব্য দেন বিএনপির চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের বিস্তারিত জানান। পাশাপাশি মির্জা ফখরুলের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মির্জা ফখরুল নিজেও ওই নির্বাচনে ভোট দেবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তাঁর ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য হবে। এরপরই বিদায়ী বক্তব্য দিতে দাঁড়ান মির্জা ফখরুল।
পরে বক্তব্য দেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে দলীয় সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তারেক রহমান বলেন, দলের কঠিন সময়ে মির্জা ফখরুল সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কখনো দলের হাল ছাড়েননি। বিভিন্ন সময়ে তাঁকে কারাবন্দীও হতে হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি দলীয় সংসদ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল থাকার নির্দেশনা দেন।
তারেক রহমান একই সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলীয় সংসদ সদস্যদের সতর্ক করেন। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া হওয়ায় এবার পরিস্থিতি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হবে। সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের দূরত্ব যেন তৈরি না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলেন তিনি। দলের ভেতরে সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন। স্থানীয় পর্যায়ে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের প্রার্থী করার পাশাপাশি দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কেউ যেন অবস্থান না নেন, সে বিষয়েও আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান।
মির্জা ফখরুলের আবেগঘন বিদায়ী বক্তব্য এবং তারেক রহমানের সাংগঠনিক বার্তা—দুই মিলিয়ে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিদায়ের মুহূর্তে আবেগ প্রকাশ করেছেন মির্জা ফখরুল, অন্যদিকে সামনে থাকা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিএনপির এই সিদ্ধান্ত এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।




























