ঢাকা ০৮:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লালদিঘী’র জলের রঙ কি আসলেই লাল?

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৭:৫৫:১০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫০২

লালদিঘি। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘লালদিঘি’ এক সুপরিচিত এবং ঐতিহাসিক স্থান। এই দিঘির নাম শুনলেই অনেকের মনে প্রথমে যে প্রশ্নটি উঁকি দেয় তা হলো—দিঘির জলের রঙ কি আসলেই লাল? ব্রিটিশ আমলে অনেকেই নাকি এই লাল জল দেখার আশায় ছুটে আসতেন! তবে ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এই দিঘির জলের রঙের সাথে ‘লাল’ শব্দের কোনো সম্পর্ক নেই।

এর নামকরণের গভীরে লুকিয়ে আছে ঔপনিবেশিক আমলের কিছু ঐতিহাসিক ভবন। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে, ১৭৬১ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের শাসনভার গ্রহণ করে। সেসময় তারা প্রশাসনিক কাজের জন্য বিভিন্ন ভবন নির্মাণ ও সংস্কার করে। বর্তমান মেট্রোপলিটন পুলিশ অফিস সংলগ্ন তহসিল অফিস ভবনটিকে তখন সম্পূর্ণ লাল রঙে রাঙানো হয়েছিল, যা স্থানীয়দের কাছে ‘লালকুঠি’ নামে পরিচিতি পায়।

​এই লালকুঠির ঠিক পূর্ব দিকেই ছিল ব্রিটিশদের পাহারায় থাকা একটি কারাগার। এই কারাগার ভবনটিকেও লাল রঙ করা হয়েছিল, যার ফলে মানুষ এটিকে ‘লালঘর’ বলে ডাকতে শুরু করে। এই লালকুঠি এবং লালঘরের পাশেই ছিল একটি সাধারণ ছোট পুকুর।

ইংরেজ শাসনের শুরুর দিকে ব্রিটিশরা এই ছোট পুকুরটিকে সংস্কার ও পরিবর্ধন করে বিশালাকার দিঘিতে রূপান্তর করে। লাল ভবনগুলোর পাশে অবস্থিত হওয়ার কারণেই লোকমুখে এই জলাশয়টি চিরতরে ‘লালদিঘি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

রায় বাহাদুর রাজকুমার ঘোষ স্কয়ার বা লালদিঘির মঠ
১৯৩৯ সালে নির্মিত রায় বাহাদুর রাজকুমার ঘোষের স্মৃতিবিজড়িত মঠ। ছবি: সংগৃহীত

শুধু নামকরণের চমকপ্রদ ইতিহাসেই নয়, লালদিঘি ও এর আশপাশের ময়দান বহু ঐতিহাসিক স্থাপনার নীরব সাক্ষী। ১৯৩৯ সালে দিঘির উত্তর পাড়ে রাউজানের জমিদার রায় বাহাদুর রাজকুমার ঘোষ একটি দৃষ্টিনন্দন মঠ নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া তৎকালীন ব্রিটিশ কমিশনার স্যার হেনরি রিকেটসের স্মৃতি ধরে রাখতে দিঘির পশ্চিম তীরে নির্মাণ করা হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘রিকেট ঘাট’।

​লালদিঘির ময়দান চট্টগ্রামের মানুষের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম সূতিকাগার। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদখ্যাত ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ দাবির প্রথম জনসভা করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ময়দানকেই বেছে নিয়েছিলেন।

​অন্যদিকে, ১৯০৯ সাল থেকে প্রখ্যাত সমাজকর্মী আবদুল জব্বার সওদাগরের উদ্যোগে শুরু হওয়া ঐতিহ্যবাহী ‘জব্বারের বলীখেলা’ এই এলাকাকে দেশজুড়ে অনন্য পরিচিতি এনে দিয়েছে। প্রতি বছর এই বলীখেলাকে কেন্দ্র করে দিঘির চারপাশে যে সুবিশাল বৈশাখী মেলা বসে, তা চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ মিলনমেলা।

​কালের বিবর্তনে লালদিঘির চারপাশ এখন বহুতল ভবন আর যান্ত্রিক শহরের কোলাহলে পূর্ণ। তবে এত ব্যস্ততার মাঝেও লালদিঘির পাড়ে গড়ে ওঠা আধুনিক পার্কটি নগরবাসীর জন্য এক টুকরো স্বস্তির জায়গা। প্রতিদিন সকাল-বিকেল শত শত মানুষ এখানে ছুটে আসেন একটু প্রাণচাঞ্চল্য, শরীরচর্চা ও মানসিক প্রশান্তির খোঁজে।

জনপ্রিয় সংবাদ

লালদিঘী’র জলের রঙ কি আসলেই লাল?

Update Time : ০৭:৫৫:১০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘লালদিঘি’ এক সুপরিচিত এবং ঐতিহাসিক স্থান। এই দিঘির নাম শুনলেই অনেকের মনে প্রথমে যে প্রশ্নটি উঁকি দেয় তা হলো—দিঘির জলের রঙ কি আসলেই লাল? ব্রিটিশ আমলে অনেকেই নাকি এই লাল জল দেখার আশায় ছুটে আসতেন! তবে ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এই দিঘির জলের রঙের সাথে ‘লাল’ শব্দের কোনো সম্পর্ক নেই।

এর নামকরণের গভীরে লুকিয়ে আছে ঔপনিবেশিক আমলের কিছু ঐতিহাসিক ভবন। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে, ১৭৬১ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের শাসনভার গ্রহণ করে। সেসময় তারা প্রশাসনিক কাজের জন্য বিভিন্ন ভবন নির্মাণ ও সংস্কার করে। বর্তমান মেট্রোপলিটন পুলিশ অফিস সংলগ্ন তহসিল অফিস ভবনটিকে তখন সম্পূর্ণ লাল রঙে রাঙানো হয়েছিল, যা স্থানীয়দের কাছে ‘লালকুঠি’ নামে পরিচিতি পায়।

আরও পড়ুন  ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ

​এই লালকুঠির ঠিক পূর্ব দিকেই ছিল ব্রিটিশদের পাহারায় থাকা একটি কারাগার। এই কারাগার ভবনটিকেও লাল রঙ করা হয়েছিল, যার ফলে মানুষ এটিকে ‘লালঘর’ বলে ডাকতে শুরু করে। এই লালকুঠি এবং লালঘরের পাশেই ছিল একটি সাধারণ ছোট পুকুর।

ইংরেজ শাসনের শুরুর দিকে ব্রিটিশরা এই ছোট পুকুরটিকে সংস্কার ও পরিবর্ধন করে বিশালাকার দিঘিতে রূপান্তর করে। লাল ভবনগুলোর পাশে অবস্থিত হওয়ার কারণেই লোকমুখে এই জলাশয়টি চিরতরে ‘লালদিঘি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

আরও পড়ুন  ধর্ষণ মামলায় ফাদার গ্রেগরী বেকসুর খালাস, উচ্চ আদালতে যাবে রাষ্ট্রপক্ষ
রায় বাহাদুর রাজকুমার ঘোষ স্কয়ার বা লালদিঘির মঠ
১৯৩৯ সালে নির্মিত রায় বাহাদুর রাজকুমার ঘোষের স্মৃতিবিজড়িত মঠ। ছবি: সংগৃহীত

শুধু নামকরণের চমকপ্রদ ইতিহাসেই নয়, লালদিঘি ও এর আশপাশের ময়দান বহু ঐতিহাসিক স্থাপনার নীরব সাক্ষী। ১৯৩৯ সালে দিঘির উত্তর পাড়ে রাউজানের জমিদার রায় বাহাদুর রাজকুমার ঘোষ একটি দৃষ্টিনন্দন মঠ নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া তৎকালীন ব্রিটিশ কমিশনার স্যার হেনরি রিকেটসের স্মৃতি ধরে রাখতে দিঘির পশ্চিম তীরে নির্মাণ করা হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘রিকেট ঘাট’।

​লালদিঘির ময়দান চট্টগ্রামের মানুষের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম সূতিকাগার। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদখ্যাত ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ দাবির প্রথম জনসভা করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ময়দানকেই বেছে নিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন  কৃষক কবির হোসেন মৃত্যু: ভাইরাল সেই কৃষকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোক

​অন্যদিকে, ১৯০৯ সাল থেকে প্রখ্যাত সমাজকর্মী আবদুল জব্বার সওদাগরের উদ্যোগে শুরু হওয়া ঐতিহ্যবাহী ‘জব্বারের বলীখেলা’ এই এলাকাকে দেশজুড়ে অনন্য পরিচিতি এনে দিয়েছে। প্রতি বছর এই বলীখেলাকে কেন্দ্র করে দিঘির চারপাশে যে সুবিশাল বৈশাখী মেলা বসে, তা চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ মিলনমেলা।

​কালের বিবর্তনে লালদিঘির চারপাশ এখন বহুতল ভবন আর যান্ত্রিক শহরের কোলাহলে পূর্ণ। তবে এত ব্যস্ততার মাঝেও লালদিঘির পাড়ে গড়ে ওঠা আধুনিক পার্কটি নগরবাসীর জন্য এক টুকরো স্বস্তির জায়গা। প্রতিদিন সকাল-বিকেল শত শত মানুষ এখানে ছুটে আসেন একটু প্রাণচাঞ্চল্য, শরীরচর্চা ও মানসিক প্রশান্তির খোঁজে।