জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী এলাকায় পাহাড় কেটে বসতি তৈরি ও সরকারি জমি দখলের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বরইতলীতে পাহাড়ের ঢাল ও খাঁজে গড়ে উঠেছে টিন, বাঁশ ও বেড়ার তৈরি অসংখ্য ঘর। কোথাও পাহাড় কেটে জায়গা সমতল করে নতুন ঘর তৈরি করা হচ্ছে, আবার কোথাও এরই মধ্যে স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের হিসাবে, শুধু বরইতলীতেই তিন শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। আশপাশের পাহাড়েও রয়েছে আরও কয়েক শ ঘর। ফলে এলাকাটি ভবিষ্যতে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের মতো বড় বসতিতে পরিণত হতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
১. সরকারি জমিতে বসতি, উঠছে প্লট বিক্রির অভিযোগ
ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার কয়েকটি বিএস দাগের মোট ৯৪ দশমিক ৪৫ একর জমি সরকারি ভূমি হিসেবে নথিভুক্ত। এসব জমির মধ্যে টিলা, ছন খোলা ও নাল শ্রেণির জমি রয়েছে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব এলাকার বড় একটি অংশে পাহাড় রয়েছে এবং বিভিন্ন জায়গায় বসতি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই ৭০ হাজার টাকা থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়ে ছোট জায়গা কিনেছেন। তবে অধিকাংশের কাছেই জমির বৈধ মালিকানার দলিল নেই। এমনকি পাঁচটি সেমিপাকা ঘরসহ একটি জায়গা ৭ লাখ টাকায় হাতবদলের লিখিত কাগজও পাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিবেদক। ফলে সরকারি জমিতে কীভাবে জায়গা কেনাবেচা হচ্ছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
২. পাহাড় কাটার প্রমাণ পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর
জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী এলাকায় শুধু বসতি গড়ে ওঠার অভিযোগ নয়, পাহাড় কাটার প্রমাণও পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সংস্থাটির পরিদর্শনে ১৪টি স্থানে পাহাড় কাটার তথ্য পাওয়া যায়। এসব স্থানে মোট ১৮ হাজার ৯৯৪ ঘনফুট বা প্রায় ৫৩৮ ঘনমিটার পাহাড়ি মাটি কাটার প্রমাণ মিলেছে। পরে ১৪ জনকে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, জরিমানা হলেও কাটা পাহাড়ের জায়গায় অনেক ঘর এখনো রয়েছে এবং সরকারি জমি দখলমুক্ত হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সরকারি খাসজমি কীভাবে দখল বা কেনাবেচার পর্যায়ে গেল, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। পাহাড় কাটার বিষয়ে বাংলাদেশের পরিবেশ আইনে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৬(খ) ধারায় পাহাড় বা টিলা কাটা ও অপসারণের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
৩. জঙ্গল সলিমপুরের সঙ্গে কেন তুলনা করা হচ্ছে
জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীর বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের শুরুর সময়ের মিল খুঁজে পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। জঙ্গল সলিমপুরেও পাহাড় দখল, প্লট তৈরি, অর্থের বিনিময়ে জায়গা হাতবদল এবং পরে স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠার অভিযোগ ছিল। সময়ের সঙ্গে সেখানে বসতি বড় আকার ধারণ করায় উচ্ছেদ ও দখলমুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বরইতলী এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে একই ধরনের প্রবণতা শুরুতেই বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বরইতলীতে বসতি গড়ে ওঠার ইতিহাস প্রায় চার দশকের। ১৯৮০-এর দশকে এলাকায় অল্পসংখ্যক ঘর থাকলেও পরে বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ এসে বসতি গড়তে শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ঘরের সংখ্যা।
৪. নিম্ন আয়ের মানুষের হাত ধরে বাড়ছে বসতি
বরইতলীতে বসবাসকারীদের বড় একটি অংশ নিম্ন আয়ের মানুষ। তাঁদের মধ্যে পোশাকশ্রমিক, গাড়িচালক, দিনমজুর ও রংমিস্ত্রিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, তাঁরা নিজেরা পাহাড় কাটেননি। জায়গা বিক্রির আগে বিক্রেতারাই পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লট তৈরি করে দিয়েছেন। পরে সেখানে ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করেছেন তাঁরা। তবে জায়গা কেনার পরও বৈধ মালিকানার দলিল না থাকায় ভবিষ্যতে উচ্ছেদ হলে তাঁদের কী হবে, সেটি নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনের প্রয়োজনকে সামনে রেখে যদি অবৈধ দখলদারদের একটি চক্র জায়গা বিক্রির সুযোগ তৈরি করে, তাহলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু বসতি উচ্ছেদ নয়, এর পেছনে থাকা জমি কেনাবেচার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
৫. জেলা প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
পরিস্থিতি নিয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, এলাকাটিকে আরেকটি জঙ্গল সলিমপুরে পরিণত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না এবং দ্রুত অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, সরকারি খাসজমি দখল ও পাহাড় কাটার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। শুধু জরিমানা করে যদি পাহাড় কাটা বন্ধ না হয়, তাহলে একই জায়গায় আবারও মাটি কাটা বা নতুন ঘর তৈরির আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই পাহাড় সংরক্ষণ, সরকারি জমি দখলমুক্ত করা এবং অবৈধ প্লট বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৬. সময় থাকতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী এখনো বড় আকারের অবৈধ বসতিতে পরিণত হয়নি। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, পাহাড় কাটা বন্ধ, সরকারি জমির সীমানা নির্ধারণ, অবৈধভাবে তৈরি স্থাপনা চিহ্নিত করা এবং জায়গা কেনাবেচার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা একসঙ্গে নিতে হবে। পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত ও নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনের বিষয়টিও মানবিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ শুধু উচ্ছেদ করলে সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না। অন্যদিকে পাহাড় কাটা অব্যাহত থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বর্ষায় ভূমিধস ও অন্যান্য ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই জঙ্গল সলিমপুরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী এলাকায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি। পরিবেশ অধিদপ্তরও নিয়মিত পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে, যা তাদের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে দেখা যায়।
External DoFollow Resource Suggestions



























